আবার কবে চাঙ্গা হবে সিঙ্গাপুরের শ্রম বাজার

February 6, 2018, 8:22 AM, Hits: 1020

আবার কবে চাঙ্গা হবে সিঙ্গাপুরের শ্রম বাজার

জাহাঙ্গীর বাবু:যারা সিঙ্গাপুরে আসতে পাগল,ইনবক্স ভারী করছেন, সুদুউত্তর না দেয়ায় গালি দিচ্ছেন পেট ভরে,তাদের একটা সত্য ঘটনা বলি,একেবারেই সাম্প্রতিক।

এক কোম্পানীর মালিকের ছেলের বিয়ে।বড় বস বাবা,সেকেন্ড বস ছেলে।সেকেন্ড বসের বিয়ে।সিঙ্গাপুরের বাইরে।ওভারসীজে।

শ্রমিকদের বেতন চার কার্ড,মানে দুই মাস না দিয়ে উড়াল দিয়েছে ষাট জনের বহর নিয়ে। উড়ালের দিন পাঁচেক পর এক কার্ড রিলিজ হয়েছে। তিন কার্ডের হবে এক সময়। এই সময়ে খাবার চুরি হয়েছে। মানে একের অজান্তে অন্য জন্য খেয়েছেন। দশ,বিশ ডলারের হাওলাত হয়েছে।দু চার ডলার চুরির সংবাদ আছে।কর্ম ক্ষেত্র থেকে মালামাল চুরি হয়েছে।

এক জন নতুন এসেছে, পুরাতন লোক।আগে ছিলেন এখানে। ছয় হাজার ডলার খরচ। পরিচিত জন মিথ্যা বলে এনেছেন।বাইশ ডলার বেতন।এখানে আঠার ডলার।মাসে সত্তর ডলার হাউস ভাড়া কাটিং।কাজ, বাথরুম,ড্রেন,বিল্ডিং ভাঙ্গা,মানে যে কোন কাজ। সকাল, সরি ভোর চারটায় গাড়িতে বসতে হয়,সকাল আট টা থেকে কাজের হিসাব।রাত সাত টায় কাজ শেষ।ক্যাম্পে পৌছাতে দশটা।রাত দশটার কাজ হলে বারোটা। 

বেতন হয়েছে দুই মাসে পনর দিনের।খাবারের টাকা বাকী।মোবাইল বিল, খবর এসেছে কলেজ পড়ুয়া মেয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছে।ভারতীয় লোকটি পাগল প্রায়।প্রথম দিনের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে ইঞ্জিনিয়ার কে বলে আত্মীয়ের কাছে দৌড়। পরদিন সকালে ইঞ্জিনিয়ার জিজ্ঞেস করে কি খবর তোমার মেয়ের। কেঁদে উঠে হু হু করে। মেয়ের অপারেশন।ইঞ্জিনিয়ার কিছু বলেনা। দূর থেকে দেখে,ভাবে তার ও দুটি মেয়ে আছে।দশ ডলার হাতে দেয়।কাজে মন নেই দেখে,ইঞ্জিনিয়ার বলে চলে যাও।কাজে থাকলে এক্সিডেন্ট করবে।

ইঞ্জিনিয়ারের বাসা ভাড়া বাকী।গত দু'দিন ধরে বাসার কেয়ার টেকার তাড়া দিচ্ছে।বাস কার্ডে টাকা নেই।বাবা অপেক্ষায় আছে সংসারের খরচের।স্ত্রী সন্তানের বাসা ভাড়া,টিউশন,স্কুল ফিস।ইত্যাদী। ইঞ্জিয়ারের এক বন্ধু প্রায় প্রতিমাসেই মাসের শুরুতে বাসা ভাড়া খরচ দিয়ে সচল রাখছে তাকে। শ্রমিক বা শ্রমজিবি সবাই।পারমিট,এস পাশ, পাশে তফাৎ। কষ্ট একই ধরণ ভিন্ন।

গত কয়েকদিন হলো দাস নামে এসেছে। সেও ধরা। যে কাজের কথা সে কাজ পায়নি।তাই প্রতিদিন টেলিফোনে ব্যাস্ত।তর্কাতর্কি।হুমকি ধামকি। চলছেই।

ইঞ্জিয়ারের অবস্থা করুন।কাজ শেষ করার চাপ।ঠিকাদার ঠিক মতো আসে না।মালামাল ডেলিভারী আজকের টা তিন্ দিন,সাত দিন,পনের দিন পর।

মুল মালিক পেমেন্ট দিচ্ছেনা ঠিকাদারকে।ঠিকাদার দিচ্ছেনা কর্মাচারী আর ছোট ঠিকাদারদের।কোম্পানীর,ম্যানাজার হিমসিম খাচ্ছে।ম্যানেজ করতে।চারদিকেই হাহাকার।অর্থের সংকট।

বাংলাদেশী শ্রমিক কষ্ট করে আসে নিজে স্থিতি না পেলেও বনে যায় এজেন্ট।নিজের অর্থ ব্যয় পোষাতেই শুরু করে লোক ঠকানোর ধান্দা। ভিসা ব্যাবসা। একটি ভিসা হলে টাকা নিয়ে ক্যান্সেল করে দেয়া এখন প্রতারণার শির্ষে।একটা আই পি তে মানে ভিসাতে মুল এজেন্ট সাব এজেন্ট তিন থেকে পাঁচ জন।আর অনেক কোম্পানী কম হলে ও দু হাজার ডলার নিচ্ছে।আর পর প্রতি হাত দুই,তিন,পাঁচশত।কেউ আছে হাজার পনেরশ নিতেও দ্বিধা করেনা।কোম্পানী আছে বা নেই ভালো মন্দ বিচার্জ নয়।লোক আসলে কিংবা আই পি হলে টাকা হাতানোই মুল টার্গেট। আর দেশে যারা আছে সব জানে।কোন মতে ঢোকার পরিকল্পনা।এসেই শুরু হামলা,মামলা,মারামারি।জেনে শুনে বিষপান আর পাগল হোন,ইচ্ছা করে ধরা খান।

মানুষের সকল সময় এক যায় না। আজ আমির কাল ফকির।এই তো দুনিয়া।আজ যে ফোরম্যান কাল সে ওয়ার্কার।মেনে নিতে অনেকের কষ্ট।সব কাজ করতে হবে শ্রমিকের, এটাই সত্য।শোষিত হবে এটাই সত্য। 

দেশ আর বিদেশ ভালো চাকরী,ভালো কাজ ভাগ্যের ব্যাপার।

অনেকেই প্রশ্ন করে, আপনি বিদেশে থাকেন আর অন্যদের নিষেধ করেন? আরে ভাই আমাকে দিয়ে আপনাকে বিচার করা কি ঠিক!আমার অনেক বন্ধু আমার তিন,চার গুন বেশি সেলারীতে ছিলো এখন নেই। আবার অনেকেই অনেক ভাল আছে।আমার চেয়ে কম বেতনে ছিলো, আছে,থাকবে।

অনেক শ্রমিক ভাইয়েরা রাগে,ক্ষোভে অভিমানে জেদে দেশে ফিরে যায়,গেছে।আবার ফিরে আসতে চাচ্ছে।কারণ যে একবার বিদেশে আসে তার ঠিকানা বিদেশ হয়ে যায়।দেশে খাপ খাওয়াতে পারে না।খুব কম আছে যারা নিজেদের দেশে প্রতিস্থাপন করতে পারে।

বিদেশের কষ্ট বিদেশীরা ছাড়া কেউ বোঝেনা।

সোজা কথায় বলি,সিঙ্গাপুরের অবস্থা ভালো নয়।শ্রম বাজার সংকুচিত হয়েছে এটাই সত্য।এ দেশে আঠার ডলার সেলারী,সাপ্লাই কোম্পানীতে কাজ।যে কোন কাজ করতে হবে।এগারো মাসের পারমিট, থাকা খাওয়া প্রায় তিনশত ডলার যারা ডরমেটরীতে থাকে তাদের।রিলিজে বারোশত লেভী থাকা খাওয়া সহ দুই হাজার ডলার খরচ।সুপারভাইজার ইঞ্জিনিয়ার যারা বাইরে থাকে তাদের নুন্যতম খরচ হাজার, বারশো ডলার এই সব বিবেচনা করে, প্লেন ফেয়ার, এজেন্ট মানি হিসাব করে সিঙ্গাপুরে আসা উচিৎ। 

সব জেনে শুনে এখানে এসে মারামারি অশান্তি করে বাংলাদেশের বদনাম আর নিজেকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই।

আমি,আমরা কেন আছি,ভাগ্যে ছিলো তাই আছি।যে কদিন রিজিক আছে থাকতেই হবে। কি বলেন?

আমি কিন্তু বিভিন্ন ভাবে সত্যটা তুলে ধরি।এ দেশ,এদেশের নিয়ম কানুন সব ঠিক আছে।কাগজ পত্র ফুল টাইট ইন্সুরেন্স,আদালত,পুলিশ,সরকার, ফাস্টক্লাস।টুরিষ্টদের জন্য আর পয়সা ওয়ালাদের জন্য সিঙ্গাপুর এক বালাখানা।শ্রমিকের জন্য নয়।সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার খন ঝুঁকিপুর্ণ। সাবধান।আই পি রিজেক্ট হচ্ছে কোনরুপ কারণ দর্শানো ছাড়া।টাকা হাতিয়ে নিয়ে কেনসেল করে দিচ্ছে।যার সাথে জড়িত বাংলাদেশি শ্রমিক ও।যারা অলিখিত, প্রমান ছাড়া লাইসেন্স বিহীন ভ্রাম্যমান এজেন্ট। বেহাল হালচাল সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজারে।বাঙ্গলাদেশ হাইকমিশনের আওতায় কিন্তু এই সব আই পি যাচাই বাছাই নেই।তাদের যে কোন অনুষ্ঠানে ফিতা কাটানোই উত্তম।তারাও বই মেলা,সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা,উচ্চমার্গীয় সেমিনার।সিম্পোজিয়াম, সরকারী দিবস,পাসপোর্ট ইত্যাদীতেই সীমাবদ্ধ।শ্রম বাজারে ধ্বস আর রমরমা হলেই না হলেই কি, বাংলাদেশ সরকার তাদের বেতন ঠিকই দেবেন।হুন্ডি চোরাচালান,কিংবা যে কোন অপকর্ম তাদের এখতিয়ারে নয়। বর্তমান হাই কমিশন আবার জনপ্রিয় এখন বিশেষ করে পুর্বের তুলনায়।পুর্বে যারা একটি আধটু প্রতিবাদ করতেন কাগজে কলমে তারা এখন সেল্ফি তুলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন।পত্র পত্রিকায় তারিফ ও করেন। আসলেই মানুষের ঘরে ঘরে যেমন নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়,তেমনি এক লক্ষ ষাট হাজারের কে কোথায় কোন অপকর্মে জড়িত তাও পর্যবেক্ষন করা সম্ভব নয়।কোন কোম্পানি ভালো, কোন কোম্পানী মন্দ তারা জানবেই কেমন করে।কি করেইবা সেলারী ইস্যুতে কথা বলবে।এট লিষ্ট শ্রমবাজারে এখন যে বিমান ভর্তি লোক আসা যাওয়া করছে তা শ্রমিক এজেন্টদের বদৌলতে।বাংলাদেশ হাই কমিশনতো ভিসা বাড়লো কিংবা কমলো তা দেখবেনা।কোথায় কোন কোম্পানীতে আই পি হলো তাও জানার কথা না।ফেসবুকে, অনলাইনে পত্রিকায় স্বল্প টাকায় সরকারী ভাবে মালশিয়া,সৌদি আরব,কোরিয়ায় লোক জন নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখা গেলেও সিঙ্গাপুরের জন্য দেখা যায়না।কেউ আসা ও করেনা হয়তো।

সাবধান, যে আসবে তাকেই হতে হবে।টাকা তার। জীবন তার।কাউকে আঙ্গুল প্রদর্শন করে কোন লাভ নেই।কুটনৈতিক তৎপরতায় বার চাঙ্গা হবে সে আশা গুঁড়ে বালি।এক সময় টুরিষ্ট ভিসা নিয়ে এ দেশে এসে, পালিয়ে কাজ করে এই বাংলাদেশী শ্রমবাজারের সৃষ্টি।আজো টিকে আছে বৈধ,অবৈধ,প্রতারণার,ধৈর্য্যের ফলেই।  বাংলাদেশী শ্রমিকদের কষ্টের বিনিময়ে টিকে আছে এই শ্রমবাজার,অন্য কোন কারণে নয় । স্ট্রাকচারাল ডেভালামেন্ট কাজে অনেক এগিয়ে গেছে সিঙ্গাপুর,সে সেক্টরে কিছুটা বিরতিই বলাচলে। বন্ধ হয়ে গেছে  শিপইয়ার্ড বা ছোট হয়ে এসেছে ক্যাপেল শিপ ইয়ার্ড।বিভিন্ন ভুয়া কেইস,বাংলাদেশী ব্যাবসায়ীদের প্রতারবানা, ক্লাব, মদ,জুয়া,নারী কেলেংকারী, খুন,ঝগড়া, বিবাদ মারামারি সহ নানা কারণে বাংলাদেশীদের শ্রম বাজার হুমকির দ্বার প্রান্তে।ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কে নেবে?আবার কবে চাঙ্গা হবে সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ