'ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস' এ কোন বিজাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা?

February 14, 2018, 10:19 PM, Hits: 1026

'ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস' এ কোন বিজাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা?

- ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম

ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস নামে বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে একটি নতুন দিবস পালনের অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে। এটি এখন বিশেষ বিশেষ মহলে পালন করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশায় একটি ব্যবসায়িক মহল এবং হোটেল ব্যবসায়ীরা এর সাথে যুক্ত হয়ে এটি পালনকে উৎসাহিত করছে। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ডে’র ইতিহাস ও ভিত্তি কী?

‘‘আজকাল অনেক মুসলিমই প্রকৃত বিষয়টি না জেনে নানা রকম বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে। তারা কেবল তাদের সাংস্কৃতিক নেতাদের মতোই এসব ক্ষেত্রে অন্ধ অনুসারী। তারা এটি খুবই কম উপলব্ধি করে যে, তারা যা নির্দোষ বিনোদন হিসেবে করে তার শিকড় আসলে পৌত্তলিকতায়, যা তারা লালন করে তা হলো অবিশ্বাসেরই প্রতীক। তারা যে ধারণা লালন করে তা কুসংস্কার থেকেই জন্ম। এমনকি ইসলাম যা পোষণ করে এসব তার প্রত্যাখ্যান। ভালোবাসা দিবস আমেরিকা ও ব্রিটেন বাদে গোটা ইউরোপে মৃত হলেও হঠাৎ করেই তা মুসলিম দেশগুলোয় আবার অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু কার ভালোবাসা? কেন এ দিবস পালিত হবে?

অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে তারা যেমন করে, এ বিষয়েও কথিত আছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে উর্বরতা ও পশুর দেবতা বলে খ্যাত লুপারকাসের (Lupercus) সম্মানে পৌত্তলিক রীতিনীতির একটি অংশ হিসেবে রোমানরা ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন শুরু করে। এর মূল আকর্ষণ হলো পরবর্তী বছরের লটারির আগ পর্যন্ত বর্তমান বছরে লটারির মাধ্যমে যুবকদের মাঝে যুবতীদের বণ্টন করে দেয়া। এ দিন উদযাপনে অন্যান্য ঘৃণ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি ছিল, এক টুকরো ছাগলের চামড়ায় আবৃত যুবতীদের দু’জন যুবক কর্তৃক উৎসর্গকৃত ছাগল ও কুকুরের রক্তে ভেজা চাবুক দিয়ে প্রহার করা। মনে করা হতো ‘পবিত্র যুবক’দের প্রতিটি পবিত্র (?) আঘাত দ্বারা ওই সব যুবতী ভালোভাবে সন্তান ধারণে সক্ষম হবে। খ্রিস্টান সম্প্রদায় যথারীতি লুপারকালিয়ার (Lupercalia) এ ঘৃণ্য রীতিকে বন্ধ করার বৃথা চেষ্টা করল। প্রথমে তারা মেয়েদের নামে লটারির বদলে ধর্মযাজকদের নামে লটারির ব্যবস্থা চালু করল। এর উদ্দেশ্য হলো, যে যুবকের নাম লটারিতে ওঠবে সে যেন পরবর্তী একটি বছর যাজকের মতো পবিত্র হতে পারে। কিন্তু খ্রিস্টানরা খুব কম স্থানেই এ কাজে সফল হলো।

একটি জনপ্রিয় খারাপ কাজকে কিছু পরিবর্তন করে তাকে ভালো কাজে লাগানোর প্রবণতা বহু পুরোনো। তাই খ্রিস্টানরা শুধু লুপারকালিয়া থেকে এ উৎসবের নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন করতে পারল। পোপ গ্যালাসিয়াস (Gellasius) ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে এটি করল। তথাপি খ্রিস্টান কিংবদন্তিতে ৫০-এরও বেশি বিভিন্ন রকম ভ্যালেন্টাইন আছে। এদের মধ্যে মাত্র দু’জন সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যদিও তাদের জীবন ও চরিত্র এখনো রহস্যাবৃত। একটি কিংবদন্তি হলো, যেটি বেশি প্রকৃত ভ্যালেন্টাইন দিবসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন হলেন ‘প্রমিকদের যাজক’- যে নিজেকে কারাগারপ্রধানের মেয়ের প্রেমে জড়িয়ে ফেলেন।

কিন্তু কিছু মারাত্মক অসুবিধার জন্য ফ্রান্স সরকার উল্লিখিত লটারি ১৭৭৬ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কালপরিক্রমায় এটি ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানি থেকেও উঠে যায়। এর আগে সপ্তদশ শতাব্দীতে পিউরিটানরা যখন শক্তিশালী ছিল সে সময় ইংল্যান্ডে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস এটি ১৬৬০ সালে পুনরুজ্জীবিত করেন। ইংল্যান্ড থেকেই এটি নতুন বিশ্বে আগমন করে যেখানে এটিকেই টাকা বানানোর ভালো মাধ্যম হিসেবে নিতে ইয়াংকিরা (আমেরিকানরা) উদ্যোগী হয়। ১৮৪০ সালের দিকে ইস্টার এ হল্যান্ড ‘হোয়াট এলস ভ্যালেন্টাইন’ (What else Valentine) নামে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আমেরিকান ভ্যালেন্টাইন ডে কার্ড বানায় এবং প্রথম বছরই ৫০০০ ডলারের কার্ড বিক্রি হয় (তখন ৫০০০ ডলার অনেক)। সেখান থেকে ভ্যালেন্টাইন ডে ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

এটি হ্যালোইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষ ভূত এবং অপদেবতার মতো পোশাকে সজ্জিত হয়ে পৌত্তলিকদের একটি প্রাচীন শয়তানপূজার পুনঃপ্রচলন করে। পৌত্তলিকেরা এর নাম দেয় সামহাইন (Samhain) যা সোয়েন (Sowen) হিসেবে উচ্চারিত হয়। যেমনটি ভ্যালেন্টাইন ডে’র ক্ষেত্রে ঘটেছিল। খ্রিস্টানরা এর নাম পরিবর্তন করে ঠিকই, কিন্তু পৌত্তলিক শিকড় পরিবর্তন করতে পারেনি। দৃশ্যত নির্দোষ অনুষ্ঠানেরও পৌত্তলিক শিকড় থাকতে পারে। পূর্বকালে মানুষ ভূতপ্রেতকে পেত, বিশেষভাবে তাদের জন্মদিনে। একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, মন্দ প্রেরণা একজন ব্যক্তির জন্য অধিক বিপজ্জনক যখন কেউ প্রাত্যহিক জীবনে একটি পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যেমন জন্মদিনে বা একটি বছরের শুরুতে। কাজেই সে ব্যক্তির পরিবার ও চার পাশের বন্ধুবান্ধব হাসি-আনন্দের মাধ্যমে জন্মদিনে তাকে মন্দ থেকে রক্ষা করত, যাতে তার কোনো ক্ষতি না হয়। কী করে একজন সচেতন মানুষ ভাবতে পারে ইসলাম অনৈসলামিক ধারণা এবং বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত অযৌক্তিক আচার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে?

এটি একটি বিশাল ট্র্যাজেডি যে মিডিয়ার মাধ্যমে নিত্যবাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অপপ্রচারে মুসলমানেরা ভালোবাসা দিবস (Valentine day) হেলোইন (Halloween) এবং এমনকি সান্তাক্লজকেও (Sant claus) আলিঙ্গন করে নেয়।’’ (ইম্প্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল, লন্ডন, মার্চ ২০০১।

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অথবা ভালোবাসবার জন্য পৃথক কোন দিনক্ষণের প্রয়োজন নেই। হৃদয়ঘটিত দুর্নিবার আকর্ষণে মনে মিলন ঘটে চলেছে সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে। প্রেম-ভালোবাসা স্রষ্টার অপার রহস্যময় সৃষ্টিক আকর্ষণ। পৃথিবীর কোন বাঁধায় প্রেম পরাস্ত হয় না। কবিতার ভাষায় বলা যেতে পারে- ‘যাকে ভালোবাসি তুলনা খুঁজিনা তাঁর বিশ্বময় সৌন্দর্যে/উপমা অলঙ্করণে, অথবা অবাক মুগ্ধকর অনিবার্য আকর্ষণে।/ অস্তিত্বে, রক্তকণিকায় মিশে আছে সে/ তাঁকে ভালোবাসি নিঃশর্ত আবেশে,/তবু সে বুঝে নাতো হায়, ভালোবাসিবারে/ আছে কীযে দায়!’ ভালোবাসা এমনই নির্মোহ দুর্নিবার চুম্বকাকর্ষণ। ভালোবাসা- নির্ভরতা, আস্থা, বিশ্বাস।

আমাদের করণীয়

এই হল ভ্যালেন্টাইন বা ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস। এ রকম একটি পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারভিত্তিক অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে জনগণের শতকরা ৯০জন মুসলমান সেখানে কিভাবে পালিত হতে পারে? ইসলাম আমাদের প্রকৃত ও অকৃত্রিম ভালোবাসাই শিক্ষা দেয়, যা এ ধরনের অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। আমাদের দেশে এটি বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশা এবং ব্যভিচারের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এটি মুসলমানদের এবং বাংলাদেশীদের সংস্কৃতির অংশ নয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এমন কোনো অংশই, যা অশ্লীল এবং অশালীন, আমাদের দেশে অনুমোদন করা উচিত নয়। উপরন্তু বর্তমানের কর্পোরেট দুনিয়া লাগামহীন বিত্তের পেছনে ছুটছে। যে কাজে অর্থ উৎপাদন হবে, সেটাই তাদের কাছে পূজনীয়। সে কাজকেই তারা বাণিজ্য ও পণ্য বাজারজাতের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। কখনো বিনোদনের নামে পণের বিজ্ঞাপন দেয়, কখনো সংস্কৃতির নামে। কিন্তু সবকিছুর মূলে থাকে বাণিজ্য। এই যে বিভিন্ন ধরনের খেলা, ক্রিকেট, ফুটবলÑ আরও যত খেলা আছে; এগুলো দ্বারা পণ্য বাজারজাত করা মূল উদ্দেশ্য। ধরুন, কোমল পানীয়ের কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা বিজ্ঞাপনের পেছনে খরচ করছে। এ টাকা সেখানে খরচ না করলে মানুষ পণ্য চিনবে না।

ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন'সডে (সক্ষেপে ভ্যালেন্টাইন'স ডে) একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারি প্রেম এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত করা হয়। এই দিনে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ফুল, চিঠি, কার্ড, গহনা প্রভৃতি উপহার প্রদান করে দিনটি উদ্‌যাপন করে থাকে। ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন'স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন'স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন' দিবস ঘোষণা করেন।

ভালবাসা অবশ্যই একদিনের জন্যে নয়, তা সারা জীবনের। ব্যক্তিগতভাবে যদিও 'ভ্যালেন্টাইন ডে' উদযাপন পছন্দ করিনা I

ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোন দিনের প্রয়োজন নেই !

আমি ৩৬৫ দিনই ভালোবাসার পক্ষে! কান্না, অভিমান, দুঃখ, ভুল বুঝাবুঝি--- এসব কিছুর শেষেও ভালোবাসা থাকবে আমি তাই চাই! হোক তা বছরের যে কোন দিন--- ১লা জানুয়ারি, কিংবা ৭ই মে, অথবা ২৯ ডিসেম্বর! why only 14th feb?? cmon!! বাকি ৩৬৪ দিন কি তাহলে?? আম্মু আব্বু, ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস , আর সেই বিশেষ কাউকে প্রতি সেকেন্ডে, প্রতি beat এ feel করাই আমার কাছে বেশি আনন্দের। কাজেই এক বিশেষ দিবসেই কেন আমাকে ভাবতে হবে--- 'প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস–তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ'' !! আমি আমার সর্বনাশ ৩৬৪ দিনই ঐ চোখে দেখতে চাই!!

আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হয় ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন। সাংবাদিক শফিক রেহমান ১৯৯৩ সালে তার সাপ্তাহিক ’যায়যায় দিন’ পত্রিকার মাধ্যমে তথাকথিত ভালোবাসা দিবসের আনুষ্ঠানিক আলোকপাত করেন এবং সেই থেকে বাংলাদেশে দিবসটির ব্যপকত্বের সূচনা হয়।

ফেব্রুয়ারী মাস আমাদের ভাষার মাস। যে জাতি উর্দুর আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য লড়াই করেছে, মায়ের ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সেই জাতি আজ নিজেদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে ভিনদেশী নোংরা সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে। ভালোবাসার জন্য আলাদা একটি দিন পালন করা কি অতীব জরুরি? দিনক্ষণ নির্ধারন করেই কি আমাদের মা-বাবা, ভাই-বোন বা আপনজনদেরকে ভালোবাসতে হবে? ভালোবাসা তো প্রাণের সম্পদ। এটাকে বিশেষ একটি দিনের গন্ডিতে নিয়ে আসা কতটুকু যৌক্তিক? আমাদের প্রত্যেকের জন্ম হয়েছে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। তাই বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে ঢাক ঢোল পিটিয়ে এই রকম একটি দিবস পালন করার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করিনা।

মানুষ আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শরীর, মন ও আত্মা নিয়ে মানুষ। মানুষের এইসব উপাদান নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে তবুও মানব রহস্যের অনেক কিছুই অজানা। মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে চর্চা করে তার একটি হলো ভালোবাসা। দুনিয়াতে সবচেয়ে সুন্দর ও মধুময় সম্পর্কের নাম ভালোবাসা। ভালোবাসা কোনো একদিনের বিষয় নয়, এটা চিরকালের ব্যাপার। ভালোবাসাকে বিশেষ একটি দিনে ঘটা করে পালন করার সংস্কৃতি চালু করার কোনো মানে হয় না। কারণ ভালোবাসা শব্দটি পৃথিবীর কোন দার্শনিক, কবি কিংবা পন্ডিত আবিষ্কার করেননি। যিনি আবিষ্কার করেছেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন মহান আল্লাহতায়ালা। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। অথচ আমাদের এই নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভিনদেশীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার। এ অবস্থা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে না পারলে আগামী দিনে আরো ভয়াবহতা নেমে আসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবো, কোনো রাষ্ট্রে সামরিক আগ্রাসন চালানোর আগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হতো। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরুতেই বিদেশী শক্তি সে দেশের জনগণের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে দুর্বল করে দিত যাতে করে সামরিক আগ্রাসন চালানো সহজ হয়ে যায়। ভারতবর্ষের ইতিহাসেও আমরা তা দেখতে পাই। মাছের পচন যেমন শুরু হয় মাথা থেকে, ঠিক তেমনি একটি দেশ বা জাতির পচন শুরু হয় তার সংস্কৃতি থেকে। ভ্যালেন্টাইন ‘ডে’র ইতিহাস যদি মুসলমানের সন্তানেরা জানতো তাহলে এরকম ভালোবাসা দিবসের আয়োজনকে থুথু নিক্ষেপ করে প্রতিবাদ করতো। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তারা আজ ভ্যালেন্টাইনের নোংরা সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। আমাদের দেশে এই বাণিজ্যিক ভালোবাসার সংস্কৃতি আমদানি করেছিলেন সাংবাদিক শফিক রহমান।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। এ দেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মুসলমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হওয়ার কারনে এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে ইসলামী তথা মুসলিম সংস্কৃতির মেলবন্ধন সেই সুদীর্ঘ কাল থেকে। আর বাঙালি হিসেবে আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সংস্কৃতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এদেশের গণমানুষের সাহিত্য, সংগীত, উৎসব, পোষাক, ভোজনরীতি ইত্যাদির আলাদা আলাদ রূপ বিরাজমান। যা আমাদের বাঙালি স্বকীয়তাকে বহন করে চলছে। তদুপরি আমরা অনুকরণ প্রিয় জাতি হিসেবে ভিনদেশী অনেক সংস্কৃতি কাল-পরিক্রমায় বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দোষের কিছু নয় কেননা পৃথিবীতে কোন সংস্কৃতিই ইউনিক নয়। কালের বিবর্তনে সমযের পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতির জগতকে সমৃদ্ধ করে অন্যের সংস্কৃতি দিয়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যখন বাচ-বিচার না করে নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে কোন বিষয়কে নিজেদের সংস্কৃতিতে একীভূত করে নিই। আবহমান বাংলার চিরায়িত সংস্কৃতি ও স্বকীয়তার বিকাশকে বিনষ্ট করতে পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে বহু আগে থেকেই। সাম্রাজ্যবাদী কিংবা মিশনারী আদিপত্যবাদীরা নানান ছলে আমাদের সমাজে তাদের সংস্কৃতির জাল বিস্তার করছে। কেউ আবার তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এভাবে আমরা নিত্য প্রভাবিত হচ্ছি কোন না কোন বিজাতীয় অপসংস্কৃতির।

বর্তমানে প্রচলিত ভ্যালেন্টাইন ডে এমন একটি সংস্কৃতি যার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা অনুসঙ্গ কোন ভাবে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি কিংবা মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি আমাদের জন্য কোন সুন্দর ও হিতকর ফলাফলও বয়ে আনবেনা। অথচ আজ বাংলাদেশের তরুন-তরুনী থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ভ্যালেন্টাইন সংস্কৃতিতে পাগলপারা। শুধু যে তরুন সমাজ এতে মত্ত তা কিন্তু নয় আমাদের সমাজে যারা ’সুশীল’ নামে পরিচিত তারা সহ সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় সকলে এই দিনকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়। দিনটি উপলক্ষ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় থাকে বিশেষ আয়োজন। বিশেষ করে আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেল গুলোতে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের হিড়িক পড়ে যায়। রাজধানী ঢাকা সহ অনেক জায়গায় দিনটি উপলক্ষে বিশেষ র‌্যালী, কনসার্ট সহ বিভিন্ন আয়োজন থাকে যেখানে খরচ হয় বিরাট অংকের টাকা।

যে দেশে এখনো লক্ষ মানুষ বাসস্থানের অভাবে রাস্তার ধারে, রেল ষ্টেসনে রাত কাটায়, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হাজারো মানুষ দুমুঠো অন্নের তাগিদে ময়লার স্তুপ থেকে উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করে সেই দেশে এই অনৈতিক ও অপসংস্কৃতির চর্চা করে লক্ষ লক্ষ টাকার অপচয় করার যৌক্তিকতা কতটুকু তা আমাদের ভাবা উচিত। একদিকে আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা ইভটিজিং রোধের কথা বলবো আর অন্যদিকে ভ্যালেন্টাইন ডে কিংবা থার্টিফাস্ট নাইট উদযাপনের নামে নারী-পুরুষের অবাধ ও অনৈতিক মেলামেশার সুযোগ করে দিব তা তো হতে পারেনা।

সংস্কৃতি সময়ের হাত ধরে তার জায়গা করে নেবে দেশ-কালের দেয়াল ভেঙ্গে কিন্তু যে সংস্কৃতি আমরা গ্রহণ করছি তা আমাদেরকে কতটুকু মানবিক করে তুলছে ভেবে দেখা জরুরি। সংস্কৃতি যদি আমাদেরকে মানবিকতার পরিবর্তে অশ্লীলতা বা অনৈতিকতা শিক্ষা দেয় তাহলে সেই সংস্কৃতি বর্জন করা-ই বাঞ্ছনীয়।

সত্যিকার অর্থে ভ্যালেনটাইনস ডে একটি প্রতিবাদ বা শোক দিবসের নাম হওয়া উচিত ছিলো। তা না হয়ে এটি হয়েছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বিবাহ করা প্রত্যেক মানব সন্তানের মৌলিক অধিকার। সে বিবাহ করার অপরাধে যদি কাউকে মৃত্যুদÐ দেয়া হয় তাহলে এর চেয়ে বড় অবিচার আর কি হতে পারে? তার চেয়ে বেশি মনে কষ্ট দেয় যখন বিবাহের এই সার্বজনীন অধিকার ও কর্তব্য পালনের ঘটনাটি অবলম্বন করে তার ঠিক বিপরীত কাজটি অর্থাৎ বিবাহ বহির্ভূত নারী-পুরুষের মিলনকে উৎসাহিত করার জন্য নোংরামিকে জাগিয়ে তোলা হয়। আর এই সুযোগে কিছু বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ী তাদের পণ্যের প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চ্যানেলগুলোতে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের দৃষ্টির সামনে অশ্লীলতার পসরা তুলে ধরে।

আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন বিশ্বভালোবাসা দিবস উদযাপন করলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো উপকার হবে কি না? যদি না-ই হয়ে থাকে তাহলে কেন ভিনদেশীয় সংস্কৃতির জোয়ারে আমরা গা ভাসিয়ে দিচ্ছি? দিন ক্ষণ ঠিক করে আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোনদের কেন ভালোবাসতে হবে? আমার জন্ম তো হয়েছে ভালোবাসার পরশ দিয়ে। জন্মের শুরুতেই আমরা বাবা-মাকে ভালোবেসে বড় হয়েছি। আমাদের মায়েরা শত কষ্ট সহ্য করে ভালোবাসার পরশ দিয়ে আমাদের মানুষ করেন। ভালোবাসা তো আমাদের প্রাণের সম্পদ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে পারবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে দিন সূর্যটা অধিক নিকটবর্তী হয়ে যাবে, আল্লাহর আরশের নিচে আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষ আরশের ছায়ার নিচে স্থান পাবে। তার মধ্যে ঐ দুই ব্যক্তি থাকবে যারা আল্লাহর সন্তুুষ্টির জন্য পরস্পরকে ভালোবেসেছিলো।’ আমাদের ইতিহাস ভুলে গিয়ে আমরা ভিনদেশীয় সংস্কৃতি উদযাপন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। বিশ্ব ভালোবাসার নামে যে, বেহায়াপনা-অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ছে তরুণ-তরুণীরা তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এমনিতেই আমাদের তরুণ-তরুণীদের অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তারপর আবার নতুন নতুন দিবস পালনের নামে নোংরামির পথকে প্রসারিত করতে দেয়া মোটেও সুখকর নয়। ভালোবাসা দিবস আমাদের সংস্কৃতি না হলেও মিডিয়ার বদলৌতে সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছে। মিডিয়াগুলো ভালোবাসা দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠন প্রচার করে দেশীয় সংস্কৃতিকে আরো পিছনে ঠেলে দিচ্ছে। যারা ইসলামী মূল্যবোধের কথা শুনলেই নাক ছিটকান তাদের কাছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু বিবেকমান মুসলমানের বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের প্রতি বিন্দু মাত্র আগ্রহ থাকা উচিত নয়। সমাজের বিবেকমান মানুষের বিবেকের কাছে বিনীত প্রশ্ন করতে চাই, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের মাধ্যমে আমরা কি নারী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণের মতো ঘৃন্যতম কাজ থেকে আমাদের তরুণীদের রক্ষা করতে পেরেছি? যে দেশের চলন্ত বাসে নারীরা ধর্ষিতা হয় সেদেশের জনগণের বিশ্ব ভালোবাসা দিবস মোটেও সুখের বার্তা বহন করে নিয়ে আসবে না। ভালোবাসা দিবসের ফলে সমাজে অসামাজিকতা, অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতা ও অবৈধ যৌনতার প্রতি আসক্তি বাড়ছে। মানবিক, নৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ মারাত্মক হ্রাস পাচ্ছে। ভালোবাসার দিবসে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহর, পার্ক, রেস্তোরাঁ, ভার্সিটির করিডোর, টিএসসি, ওয়াটার ফ্রন্ট, ঢাবির চারুকলার বকুলতলা, আশুলিয়া, পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর হল রুম সর্বত্র প্রেমিক-প্রেমিকার অশ্লীল ভালোবাসার নোংরামিতে জয়জয়কার। একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে নিয়মিত মার্কেটিং করে যুবসমাজের মধ্যে এই ব্যভিচারের প্রসার বাড়াচ্ছে। অবিলম্বে পারিবারিক মূল্যবোধ সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী এই অশ্লীল ভ্যালেন্টাইনস ডে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ