কে এই ডায়মন্ড কিং

February 18, 2018, 6:10 PM, Hits: 519

কে এই ডায়মন্ড কিং

হ-বাংলা নিউজ :  পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (পিএনবি) ১১ হাজার ২০০ কোটি রুপির আর্থিক কেলেঙ্কারিতে নাম উঠে এসেছে ভারতের একজন হীরা ব্যবসায়ীর। বিশ্বজুড়েই তাঁর প্রতিষ্ঠানের হীরার গয়নার দারুণ সুনাম। শুধু বলিউডের তারকারাই নন, হলিউড এমনকি অনেক দেশের রাজপরিবারের সদস্যরাও পরছেন এই গয়না। ব্যাংক কেলেঙ্কারির খবর সামনে আসার পর এখন প্রশ্ন—কে এই ব্যবসায়ী?

তাঁর নাম নীরব মোদি—যিনি ভারতের ‘ডায়মন্ড কিং’ বলেও পরিচিত। ভারত থেকে পালিয়ে নীরব এখন সুইজারল্যান্ড কিংবা বেলজিয়ামে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় তাঁকে বলা হচ্ছে ভারতের নতুন বিজয় মালিয়া। অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কোটিপতি মালিয়া এখন পলাতক।

নীরব আদতে গুজরাটের মানুষ। ৪৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী নীরব মুম্বাইয়ে ঘাঁটি গেড়ে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১১ হাজার ২০০ কোটি রুপি ঋণ নেন। চলতি বছরের প্রথম দিনেই বিদেশ পালিয়ে গেছেন তিনি। এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর স্ত্রী-ভাই ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা দেশ ছাড়েন। ইতিমধ্যে নীরবসহ তাঁর ঘনিষ্ঠদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছে ভারত সরকার।

ফোর্বস সাময়িকীর তালিকায় ২০১৬ সালে ভারতের অন্যতম ধনকুবের ছিলেন নীরব। পরের বছর ধনকুবেরদের বিশ্বতালিকায় তাঁর স্থান হয় ১ হাজার ২৩৪তম।

ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় নীরব মোদিকে বলা হচ্ছে ভারতের নতুন বিজয় মালিয়া। ছবি: সংগৃহীতব্যাংক কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় নীরব মোদিকে বলা হচ্ছে ভারতের নতুন বিজয় মালিয়া। ছবি: সংগৃহীত

নীরবের শুরু

নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে জন্ম নেওয়া নীরব মোদি বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরে বেড়ে ওঠেন। পড়া শেষ না করেই ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ওয়ার্টন স্কুল ছাড়েন নীরব মোদি। ছোটবেলা থেকেই তার ঝোঁক ছিল কোনো কিছুর নকশার দিকে। সেই নেশায় ইউরোপের বড় বড় জাদুঘর চষে বেড়ান নীরব। সেখান থেকেই শখ জন্মে হীরার দিকে। পড়াশোনা ছেড়ে ১৯ বছর বয়সে চাচা গীতাঞ্জলি জেমসের মালিক মেহুল চোসকির ব্যবসায় যোগ দেন। নয় বছর সেখানে কাজ করেন। এরপর ১৯৯০ সালে নিজে হীরার ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে গড়ে তোলেন ‘ফায়ার স্টার’ নামের হীরার কোম্পানি।

২০১৫ সালে আজকের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ে নীরবের প্রথম হীরার শোরুম উদ্বোধন করেন। লন্ডন, লাসভেগাস, হাওয়াই, নিউইয়র্ক, সিঙ্গাপুর সিটি, বেইজিং ও ম্যাকাওতে শোরুম আছে নীরবের। ভারতের মুম্বাই ও দিল্লিতে তাঁর ব্যবসা রয়েছে। ইতালিতে নীরবের প্রাসাদসম এক বাড়ি রয়েছে। নীরব মোদির স্ত্রী অমি মোদি। তিন সন্তানের জনক নীরবের প্রতিষ্ঠানে গয়নার দাম শুরু হয় পাঁচ রুপি থেকে। সর্বোচ্চ ৫০ কোটি রুপির গয়না বিক্রি হয় তাঁর শোরুমে। নীরবের ‘ফায়ার স্টার’ কোম্পানির সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৩০ কোটি ডলার। আর ব্যক্তি হিসেবে তিনি ১৭৪ কোটি ডলার সম্পদের মালিক।

হলিউড তারকা কেট উইন্সলেট, নাওমি ওয়াটস, পরিচালক স্টিফেন স্পিলবার্গ থেকে শুরু করে বলিউডের ঐশ্বরিয়া রাই, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লিসা হেডেনের মতো অনেকেই নীরব মোদির গয়না পরে বিজ্ঞাপন করেছেন। এই গয়না পরে অস্কারের রেড কার্পেটেও হেঁটেছেন কেট উইন্সলেট।

৪৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী নীরব মুম্বাইয়ে ঘাঁটি গেড়ে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১১ হাজার ২০০ কোটি রুপি ঋণ নেন। ছবি: সংগৃহীত৪৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী নীরব মুম্বাইয়ে ঘাঁটি গেড়ে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১১ হাজার ২০০ কোটি রুপি ঋণ নেন। ছবি: সংগৃহীত

কেলেঙ্কারি তদন্তে সিবিআই

পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ২০০ কোটি রুপির দুর্নীতি হয়েছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে। এ ঘটনার তদন্ত করে সিবিআই তাদের অভিযোগপত্রে বিষয়টি তুলে ধরে।

পাঞ্জাব ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা মনোজ কারাত ও গোকুল নাথ শেঠিকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিবিআই। গীতাঞ্জলি গ্রুপ অব কোম্পানির (নীরব মোদির মালিকানাধীন হীরার দোকান) ২৬টি শাখায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় পাঞ্জাব ব্যাংকের ১০ কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সিবিআই মনে করছে, ব্যাংকটির দুজন কর্মীর নাম সামনে এলেও পুরো ঘটনার পেছনে আরও কর্মী জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের খোঁজ চলছে।

নীরবের আগেও যাঁরা

ব্যাংক কেলেঙ্কারির এমন ঘটনা ভারতে প্রথম নয়। নীরব মোদির আগেও অর্থ কেলেঙ্কারি করে অনেক আলোচিত ব্যক্তি দেশ ছেড়েছেন। এ তালিকায় আছেন কয়েক মামলার আসামি বিজয় মালিয়া। তাঁর বিরুদ্ধে নয় হাজার কোটি রুপি কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। মোট ১৭টি ব্যাংক একযোগে মালিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। ভারত থেকে পালিয়ে মালিয়া এখন ইংল্যান্ডে।

আইপিএলের যাঁর হাত ধরে শুরু, সেই ললিত মোদির বিরুদ্ধে টুর্নামেন্টে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। ২০১০ সালে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই ললিত মোদি ইংল্যান্ডে। ইন্টারপোলের নোটিশও জারি হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

দীপক তালওয়ার করপোরেট কনসালট্যান্টের দীপক তালওয়ারের বিরুদ্ধে আয়কর কেলেঙ্কারির পাঁচটি অভিযোগ রয়েছে। কোটি কোটি রুপি আত্মসাৎ করার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। ইউপিএ সরকারের আমলে ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই দেশ ছেড়ে দীপক পালিয়ে যান। এখন তিনি আছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

কর ফাঁকির মামলায় অস্ত্র সরবরাহকারী সঞ্জয় ভান্ডারির নাম জড়িয়ে পড়ায় তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালান আয়কর কর্মকর্তারা। সেখান থেকে প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটা-সংক্রান্ত গোপন নথি উদ্ধার হয়। দিল্লি আদালত সঞ্জয়কে ‘অফিশিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট’-এ দাগী বলে চিহ্নিত করেছে। আলোচনা আছে, সঞ্জয় নেপালে পালিয়ে আছেন।

নাওমি ওয়াটসের সঙ্গে নীরব মোদি। নাওমি নয় হলিউড তারকা কেট উইন্সলেট, পরিচালক স্টিফেন স্পিলবার্গ থেকে শুরু করে বলিউডের ঐশ্বরিয়া রাই, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লিসা হেডেনের মতো অনেকেই নীরব মোদির গয়না পরে বিজ্ঞাপন করেছেন। ছবি: সংগৃহীতনাওমি ওয়াটসের সঙ্গে নীরব মোদি। নাওমি নয় হলিউড তারকা কেট উইন্সলেট, পরিচালক স্টিফেন স্পিলবার্গ থেকে শুরু করে বলিউডের ঐশ্বরিয়া রাই, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লিসা হেডেনের মতো অনেকেই নীরব মোদির গয়না পরে বিজ্ঞাপন করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

চলছে চাপান-উতোর

সিবিআইয়ের অভিযোগপত্র সামনে আসার পর বেশ অস্বস্তিতে আছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। প্রথমের দিকে বিজেপির মন্ত্রী থেকে শুরু করে নেতারা পুরো ঘটনা কংগ্রেসশাসিত ইউপিএ আমলে হয়েছে বলে প্রচার করছিলেন। সিবিআইয়ের অভিযোগপত্রের পর আবার বিপদে পড়ল বিজেপি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুইজারল্যান্ড সফরের সময় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলে ছিলেন এই নীরব মোদি।

নীরবের কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিবৃতি দাবি করেছেন কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী। শনিবার নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে রাহুলের দাবি, ‘অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হবে, এ বিষয়ে কেন্দ্র কী পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী দিনে কী কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিরও সমালোচনা করেন রাহুল। তাঁর কথায়, ‘হাজার হাজার কোটি রুপির দুর্নীতির পরও কেন অর্থমন্ত্রী চুপ?’ 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ