ফেসবুক লাইক

April 14, 2018, 12:18 AM, Hits: 99

ফেসবুক লাইক

হ-বাংলা নিউজ :  কামাল সাহেবের কোনো কিছুর অভাব ছিল না। স্বাধীন জীবন যাপন করছিলেন। ফেসবুকে কাউকে লাইক দিতে বাধ্য ছিলেন না। মাঝে মধ্যে যেতেন, যা ভালো লাগত দেখতেন, পড়তেন। লাইক হয়তো দিতেন না। ভালো লাগলে মনে মনে ভালো বলতেন, ভালো না লাগলে সেটাও মনের মধ্যেই রাখতেন। কারও ধার ধারেন না তিনি, আহ কী সুখ! কিন্তু বিধি হলো বাম। হঠাৎ মনে হলো, ফেসবুকে লাইক পান না কেন? এ যেন টাকার গরম, এই দেখ আমার কাছে ১০ লাখ, আরেকজন বলে, আরে ধুর, আমার আছে ৩ কোটি। তাও টাকাটা ব্যাংকে থাকে, জনগণ সরাসরি দেখতে পায় না। সবচেয়ে যে বৈষয়িক লোক, সেও জানে টাকার গরম দেখানো খুব একটা ভালো জিনিস নয়। কিন্তু ফেসবুক লাইকের গরম তো কাউকে দেখাতে হয় না! সাবজেক্ট এখানে একেবারেই নির্দোষ, মানুষ ভালোবেসে লাইক দিচ্ছে, তার দোষ কি?

বছর দু-এক আগে পেপারে বাংলাদেশের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির মূলধনের হিসাব এসেছে, তিনি চীনের কোনো একটা তালিকার মধ্যে বিশ্ব সেরা ধনীদের একজন হিসেবে স্থান পেয়েছেন। সেটাও তাঁর দোষ নয়, নিজে জাহির করেননি, চীন জাহির করেছে। বাদ বাকি অনেক অনেক ধনাঢ্য যারা আছেন, তাঁরা ফলাও করে বলেন না বা বলতে পারছেন না। কারণ বাঙালি সংস্কৃতিতে টাকার গর্ব প্রকাশ্যে করাটা বেশ নিচু মানের একটা কাজ বলে মনে করা হয়। কিন্তু ফেসবুকে লাইক? 

কামাল সাহেব নিজেকে আত্মশ্লাঘাহীন কোনো মহান মানুষ মনে করেন না। কিন্তু তাঁর ভালোই কাটছিল। হঠাৎ মাথায় এল, তার পোস্টে লাইক এত কম কেন? তাহলে কি তিনি আসলেই অন্যদের থেকে অনেক কম? জনপ্রিয়তা মাপার একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ ভাই। ভেতরে মানুষটির আত্মশ্লাঘা আছে কি না কেউ বুঝতে পারবে না। বড়ই সুবিধা। ধন্যবাদ জাকারবার্গ ভাই।

মানুষ সহজ অনেক বিষয় চোখে দেখে না। কারণ চোখে ঠুলি পরানো থাকে, নিজের বিষয়ে। যেমন কামাল সাহেব সচরাচর লক্ষ করে এসেছেন যে একটা গ্রুপের মধ্যে গেলে যারা তাঁকে বেশ অনেকবার দেখেছে তাঁরা তাঁর নাম জানে না। হয়তো মুখটা ভালোই চেনে কিন্তু নাম বলতে পারে না। কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে এটা বেশ লক্ষ্য করেছেন তিনি। সেটাকে অন্যের দোষ হিসেবেই চালিয়ে দিতেন, আর ভাবতেন ‘হু কেয়ারস’। কিন্তু অনেক যুগ পরে আবিষ্কার করলেন, ব্যাপারটা আসলে খুব সহজ। তিনি নিজেই কোনো মানুষের নাম মনে রাখার চেষ্টা করেন না, কাউকে সচরাচর নাম ধরে ডাকেন না। তিনি যা করেন, তাই অন্যেরা তাঁর বেলায় করছে। ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘হোয়াট গোজ অ্যারাউন্ড, কামস অ্যারাউন্ড।’ বাংলায়—‘যেমন কর্ম তেমন ফল।’ খুব সহজ হিসাব, কিন্তু বুঝতে লেগে গেল যুগ! যা হোক, তিনি অন্যদের নাম মনে রাখার এবং পরবর্তীতে দেখা হলে তাঁদের নাম ধরে ডাকার চেষ্টা করতে থাকলেন, ফলাফল দেখে বড়ই বিস্মিত হলেন। এমন লাগসই কার্যকারণ হবে ভাবতেই পারেননি তিনি। এখন মনে হয়, এ কাজ আগে করেননি কেন?

তারপরও এটাকে নির্দোষ ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু এখন ভ্রু কুঁচকে এর-ওর বিশাল সংখ্যক ‘লাইকের’ দিকে তাকানো এবং কীভাবে নিজের ‘লাইক’ সংখ্যা বাড়ানো যায়, এমন চিন্তা প্রশ্রয় দেওয়াকে কি নির্দোষ বলা যাবে? যদি বলাও যায়, এবং অবশ্যই বলা যায়, তবুও এর ঝকমারি মারাত্মক। সেই অন্যের নাম মনে রাখার মতোই, ঠিক একই ভাবে তাঁকেও অন্যের পোস্টে লাইক দিতে হবে। তাই লাইক দেওয়া শুরু করলেন তিনি। কেউ ছবি পোস্ট করল, দিলেন লাইক। কেউ কবিতা লিখল, দিলেন লাইক। কেউ বিরাট কোনো বুদ্ধিদীপ্ত লেখা লিখেছে যার মাত্র দুই লাইন দেখা যাচ্ছে, তারপর লেখা আছে ‘সি মোর’, তাতেও লাইক। দুই চারবার সময় নষ্ট করে পুরোটা পড়ার পরে বুঝলেন আসলে ‘সি মোর’ এর কোনো দরকার নাই। লাইক তো দিচ্ছেন লাইক পাওয়ার জন্য।

এরপর বুঝলেন অনেক মানুষকে অ্যাড করতে হবে। আগের মতো বাছ-বিচার থাকলে হবে না। একজন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল, তাকে অ্যাড করবেন কি না চিন্তা করে তিন মাস পার, তা হবে না। সবাই অ্যাড, এটা সাধারণ নির্বাচনের মতো। পাড়ার বখাটে বাবলু, স্কুলের হিংসুটে ববি, ভেজাল ডেটল বিক্রেতা মুদির দোকানি মজিদ মিয়া, সবাই অ্যাড। সবার এক ভোট, এ হলো গণতন্ত্র। অ্যারিস্টটলের এক ভোট, কামাল আহমেদেরও এক ভোট। এখন শুধু ভোটার বাড়ান, ফেসবুকে সফল হোন।

তারপর নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীর মতো হেসে কথা বলুন, কুশল জিজ্ঞাসা করুন। হায়, মুক্ত জীবনকে এ কোন দায়বদ্ধ করলে ফেসবুক? যেখানে ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন হয়, সেখানে যারা রাজনীতি করেন, ভোটে দাঁড়ান, আজ তাঁদের কামাল সাহেব অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে সমবেদনা জানালেন। কি নিদারুণ গুরুদায়িত্ব না নিয়েছেন আপনারা! হেসে কথা না বললে ওই লোকটা যদি ভোট না দেয়? জাগরণী ক্লাবে তিন মাস যাওয়া হয়নি, ওদের আজ পুরস্কার বিতরণী সভা আছে। সেখানে সাতটি ভোট, গেলেও হয়তো দেবে না, কিন্তু যদি দেয়? নাহ, যেভাবেই হোক আজ সময় করে যেতেই হবে। তাঁর ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটতে যাচ্ছে কি না কে জানে। হায় ফেসবুক, সম্পন্ন গৃহস্থকে তুমি আজ কীভাবে করলে এমন নিদারুণ কাঙাল!

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ