শূন্য থেকে কোটিপতি

April 14, 2018, 7:06 AM, Hits: 372

শূন্য থেকে কোটিপতি

হ-বাংলা নিউজ :  একদম শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু এবার তাই হয়ে শামিউল নুর প্রমাণ করলেন আমেরিকা সৌভাগ্যের দেশ, ভাগ্য গড়ার দেশ। সততা, একাগ্রতা, অধ্যবসায় ও বাধা অতিক্রমের মানসিকতা থাকলে যে কেউ আমেরিকাতে সাফল্য অর্জন করতে পারেন—তারই প্রমাণ দিলেন শামিউল নুর। 

আমেরিকায় ‘জায়রো’ নামে পরিচিত সড়কে খাবার বিক্রির দোকান ‘‘শামী’স হালাল ফুড’’-এর মালিক শামিউল নুর বর্তমানে নিউইয়র্কে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছেন। খুলেছেন রেস্তোরাঁয়। পার্শ্ববর্তী নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যেও বিস্তৃত করেছেন ব্যবসা। তাঁর ইচ্ছা, পুরো আমেরিকাতেই

ম্যাকডোনাল্ডের মতো চেইন ব্যবসা শুরু করবেন। 

প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১৯৯০ সালে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে আসা পাকিস্তান-বংশোদ্ভূত শামিউল নুর বলেন, সততাই ছিল তাঁর একমাত্র সম্বল। অংশীদারত্বমূলক ব্যবসায় বন্ধুদের প্রতারণা হতাশ না করে তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে।

শামিউল নুর বলেন, ‘আমেরিকায় এসে প্রথমে টেক্সাসে ছিলাম। নিউইয়র্ক নগরীতে এসেছি ১৯৯৭ সালে। অনেক কষ্ট করেছি। বহু কাজ করেছি। কিন্তু সেগুলো ভালো ছিল না। আমার তেমন পড়াশোনা নেই। তাই ভালো চাকরি পাইনি। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। আমার ভাই ইয়েলো ক্যাব চালাতেন। তিনি আমাকে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেন, অল্প সময়ে অনেক টাকা। আমি লাইসেন্স নিয়ে ট্যাক্সি চালাতে লাগলাম। কিন্তু ১৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় গাড়ি চালানো বিরক্তিকর এবং অস্বাস্থ্যকর। তাই অন্য পেশায় যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম।’ 

প্রতারিত হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে শামিউল বলেন, ‘আমার পাকিস্তানি বন্ধু ‘জায়রো’র ব্যবসা করতেন। আমার পরিস্থিতি দেখে তিনি তাঁর ব্যবসার অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিলে আমি তা-ই করি। আমি ওই ব্যবসার ৫০ শতাংশের মালিক হয়ে যাই। কিন্তু এই ব্যবসা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তাই তিনি আমার আস্থা ও সরলতার অপব্যবহার করলেন। বিনিয়োগ করেও কোনো লভ্যাংশ তিনি আমাকে দেননি। তাঁর এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে লাইসেন্স সংগ্রহ করি। এরপরেও তিনি আগের মতোই আমাকে লভ্যাংশ থেকে বিরত রাখেন। এতে তার প্রতি চরম অবিশ্বাস ও বিরক্তির সৃষ্টি হয়। সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে কমিউনিটির পরিচিতজনদের নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় অংশীদারত্বের ইতি ঘটিয়ে যেকোনো একজন সেই অংশ কিনে নেবেন। আমার অংশীদার তাঁর অংশ বিক্রির প্রস্তাব দিলে আমি রাজি হয়ে যাই।’ 

শামিউল জানান, এবার নতুন যুদ্ধ। এ লড়াই শুরু হয় ২০০০ সালে। মোটা অঙ্কের টাকা ধার করে পুরো ব্যবসা শুরু করি। প্রথম দুই বছর লাভের মুখ দেখিনি। অনেক পরিশ্রম করে তিন বছরের মাথায় লাভের মুখ দেখতে শুরু করি। পরে কর্মী নিয়োগ করি। ওই বছর থেকেই বেশ লাভ হতে থাকে, যা আজও অব্যাহত আছে।’ 

শামিউল বলেন, সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো গ্রাহকের সঙ্গে সততা। ব্যবসার সঙ্গে সততা। গ্রাহক হচ্ছেন ব্যবসার মূলধন। তাঁদেরকে ধরে রাখতে হবে। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করলে তাঁরা কখনোই আপনার কাছে আসবে না। তিনি বলেন, ‘কোনো খাবার বিক্রি করার আগে আমি নিজে তা খেয়ে দেখি। আমার পছন্দ না হলে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রির অনুমতি দিই না। গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা মানে নিজ ব্যবসার সঙ্গে প্রতারণা।’ 

শামী’স হালাল ফুডের কর্ণধার বলেন, ‘কোনো ভুল হলে আমি ভুল স্বীকার করি। গ্রাহকদের কাছে ক্ষমা চাই। ভুল শুধরে নিই। কোনো খাবার খারাপ হয়েছে কেউ এমন অভিযোগ করলে আমি নতুন খাবার দিই বা তাঁর অর্থ ফেরত দিই।’

শামিউল বলেন, ‘ব্যবসায় এখন তিনজন অংশীদার নিয়েছি। ১৪ বছর থেকে তাঁরা আমার সঙ্গে আছেন। কারও কোনো অভিযোগ নেই। সবার লভ্যাংশ সঠিকভাবে দিয়ে দেওয়া হয়। আমরা একে অপরকে সম্মান করি। ভালোবাসি।’ 

২০০৬ সালে শামিউলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্কে শ্রেষ্ঠ ফুড ভেন্ডর হিসেবে ‘ভেন্ডি ফুড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। গ্রাহকেরা প্রতিযোগীদের ভোট দিয়েই এটা নির্বাচন করেন। তাঁর খাবারের দোকানের সুনাম এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

শামিউল জানান, অনেক খাবারের দোকানদার এখন তাঁর কাছ থেকে পাইকারি খাবার কিনতে ভিড় জমান। প্রতিদিন তাঁরা ১৫০টির বেশি ফুডকার্ট ভর্তি খাবার সরবরাহ করেন। তাঁদের ৪০ হাজার বর্গফুট আয়তনের গুদাম রয়েছে।

ব্যবসা বিস্তৃত করা প্রসঙ্গে শামিউল বলেন, আমরা ম্যানহাটানের ৭০ ওয়েস্ট ৩৯ স্ট্রিটে ও প্রথম অ্যাভিনিউয়ের ১০৯ নম্বর স্ট্রিটে শামী’স হালাল নামে দুটি রেস্টুরেন্ট খুলেছি। নিউইয়র্কের স্ট্যাটান আইল্যান্ড ও নিউজার্সির জার্সি নগরীতে আরও দুটি রেস্টুরেন্টে কাজ চলছে। শামী’স হালাল ফুড’এর শাখা সারা আমেরিকাতে ছড়িয়ে দেওয়ার অর্থাৎ ম্যাকডোনাল্ডের মতো চেইন ব্যবসায় পরিণত করতে চাই। আমরা ‘ডে কেয়ার’ ও ‘সুপার লন্ড্রিমার্ট’ খুলছি। ভবিষ্যতে ব্যবসার অন্যান্য শাখায় আমরা প্রবেশ করব।’ 

ব্যবসা করতে চান এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ব্যবসার খুঁটিনাটি না জেনে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ব্যবসা শুরু করা মারাত্মক ভুল হবে, যে ভুল আমি করেছি। অভিজ্ঞতা ছাড়া কারও কোনো ব্যবসায় যাওয়া উচিত নয়। এ ছাড়া প্রত্যেকের সঙ্গে শতভাগ সৎ থাকতে হবে। কথায় ও কাজে এক থাকা, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা, ধৈর্যশীল হওয়া ও লোকসানে ভেঙে না পড়ে ব্যবসা অব্যাহত রাখতে হবে। এসব অনুসরণ করলেই শতভাগ সাফল্য এক সময় অবশ্যই আসবে। 

শামিউল নুর বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকটি মানবসেবামূলক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এগুলো নিউইয়র্ক ও নিউইয়র্কের বাইরেও দরিদ্র মানুষের কাছে খাবার বিতরণ করে। 

শামী’স ফুডের যাত্রা শুরু হয় নিউইয়র্ক নগরীর ব্রডওয়ে অ্যাভিনিউ লাগোয়া ৭৩ স্ট্রিটে এস্টোরিয়া ব্যাংক-সংলগ্ন ফুটপাতে। ২৪ ঘণ্টা এই দোকান খোলা থাকে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০০ খাবারের প্লেট বিক্রি হয়। অনলাইনে খাবারের অর্ডারও দেওয়া যায়। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ