আমেরিকার দিন শেষ

May 14, 2018, 12:16 AM, Hits: 288

আমেরিকার দিন শেষ

হ-বাংলা নিউজ :  একটু অতীতের কথা ভাবলেই আমেরিকার আধিপত্যবাদের বিষয়টি মাথায় আসবে। তখন আমেরিকা ছিল ‘অপরিহার্য’, বিশ্বের ‘একমাত্র পরাশক্তি’। তবে সেটা ছিল সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। এর শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। চূড়ায় পৌঁছায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার আগে।

ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য অ্যানি অ্যাপলবাম এই মন্তব্য করে সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, এ আধিপত্যবাদ গত দশকে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার শাসনামলে ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং বন্ধুর পথ পেরিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে। এটা ছিল অংশত ধোঁয়া ও আয়নার খেলা। আধিপত্যবাদ কতগুলো ধারণার ওপর টিকে ছিল। সেগুলো হলো আমেরিকার সম্পদের ওপর ভরসা, সামরিক শক্তির ভয় ও মূল্যবোধের প্রশংসা। সেটা টিকে ছিল শত্রুর অনুপস্থিতির কারণে। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছিল। চীন অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল।

পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সাংবাদিক ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশিত নিবন্ধে লিখেছেন, সর্বোপরি আধিপত্যবাদ নির্ভরশীল ছিল কূটনীতি, সামরিক শক্তি ও মিত্র দেশগুলোতে আমেরিকার বিনিয়োগ আগ্রহের ওপর। পারস্পরিক সুবিধার জন্য জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে আমেরিকা অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) গঠন ও সম্প্রসারণ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে সেনা মোতায়েন করেছিল। এশিয়া ও ইউরোপের অংশবিশেষ গণতন্ত্রের জন্য বাছাই এবং ব্যবসা-বাণিজ্যর জন্য উন্মুক্ত করেছিল। অন্য সব ক্ষেত্রে আমেরিকা অংশীদারত্ব ও সমঝোতা এবং অর্থ ও সৈন্যের মাধ্যমে একটা অবস্থান তৈরি করেছিল। যা তাকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যুদ্ধ ও শান্তির ক্ষেত্রে জোর গলায় কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

নিবন্ধে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিহাস জানেন না। তাঁর কোনো ধারণা নেই যে কীভাবে আমেরিকা ‘অপরিহার্য’ হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হয়েছিল। তবে মনে হচ্ছে, তাঁর বিশ্বাস ছিল তিনি কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ছাড়াই সে অবস্থান বজায় রাখতে, এমনকি বাড়াতে পারবেন। এ পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ‘সস্তা আধিপত্য’ (হেজেমনি অন দ্য চিপ)।

অ্যানি অ্যাপলবাম বলছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসার আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় আমেরিকার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। দেশটি ওই চুক্তি থেকে বের হলো ঠিকই, কিন্তু তারপর কী? ইরানের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জোটের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সফলভাবে অবরোধ আরোপ সম্ভব ছিল। চুক্তি পরিবর্তনও সম্ভব ছিল। যে প্রস্তাব সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় দিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও জার্মান চ্যান্সেলর। তাঁদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ইরানকে সামরিক হুমকি দেওয়াও সম্ভব হতে পারত।

তার বদলে ট্রাম্প সবচেয়ে খারাপ ব্যবস্থাটি বেছে নিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। কূটনৈতিক বিনিয়োগের বদলে আমেরিকা চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর জার্মানিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত একটি হুমকি দিয়ে টুইট করেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘ইরানে ব্যবসা পরিচালনাকারী জার্মান কোম্পানিগুলোকে অবিলম্বে কার্যক্রম গোটানো উচিত।’ এর ফলে ইউরোপীয় নেতারা ইরানের ব্যাপারে কথা বলছেন না। তাঁরা ভাবছেন, কীভাবে তাঁরা আমেরিকার অবরোধ থেকে কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করতে পারেন এবং দুর্ব্যবহারের জবাবে কীভাবে দিতে পারেন।

আমেরিকা ওই এলাকায় সামরিক বিনিয়োগ না করে তা অন্যদের করতে তাগাদা দিচ্ছে। ইরান সরকারের সৌজন্যে সম্প্রতি জানা গেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে আরও সামরিক সম্পদ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প সম্প্রতি আরব মিত্রদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কিছু আরব দেশ ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে লিপ্ত। সৌদি আরব ইয়েমেনে লড়াই করছে। সেখানে কী ঘটবে, তা কেউ বলতে পারছে না। লিবিয়ায় যা ঘটছে, তার ওপর আমেরিকার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও আরও কয়েকটি দেশ ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। সংঘর্ষ ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে চিত্র একই হবে।

নিবন্ধে বলা হয়, চিৎকার-চেঁচামেচি করে, তাগাদা দিয়ে ও আলোচনার মাধ্যমে ন্যাটো বা আরব বিশ্ব থেকে আমেরিকা কী পাবে? মিত্র, কূটনীতি ও সামরিক চুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া আমেরিকা কতটা পাবে? হতে পারে তা খুবই কম। আমেরিকার আধিপত্যবাদের সে সময়টা আসলেই সুখকর ছিল। কোনো কোনো দেশের কাছ থেকে আমেরিকার সেই অবস্থান এখনো পুরোপুরি ম্লান হয়নি। চীন ও রাশিয়া ছাড়া ইউরোপীয়দের জন্য আমেরিকা থেকে দূরে যাওয়া, বিনিয়োগের বিকল্প পথ বের করা ও বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঋণ পাওয়ার নতুন উৎসের সৃষ্টি করা সময়সাপেক্ষ। অস্ত্রে সজ্জিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এটা বুঝতে সময় লাগবে যে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আমেরিকা সরকারের সঙ্গে আলোচনার কোনো যুক্তি আর নেই। এ জন্য আমেরিকার অর্থনৈতিক নীতি ভ্রান্তিমূলক প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যখন অন্য দেশগুলোর মানুষ নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলার মজুত করবে না এবং আলোচনার টেবিলে আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রাখবে না।

নিবন্ধকার সবশেষে মন্তব্য করেছেন, অনেক বছর সময় লাগলেও পরিস্থিতি এমন হবে যখন আমেরিকা লক্ষ করবে ‘সস্তা আধিপত্য’ মানে তাদের সীমান্তের বাইরে যা কিছু ঘটুক না কেন তাতে তাদের আর তেমন কিছু বলার নেই। আজ হোক বা কাল হোক তেমনটা ঘটবে। আর সেটা ত্বরান্বিত করবেন ট্রাম্প।

ক্ষমতাগ্রহণের পর গত ১৫ মাসে ট্রাম্প জেরুজালেমে আমেরিকার দূতাবাস প্রতিষ্ঠা, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসাসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিতর্কিত-সমালোচিত হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে আমেরিকার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এভাবেই আমেরিকার দিন শেষ হয়ে যাবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ