আর কত ক্যাবচালকের প্রাণ গেলে শুনবে নগর কর্তৃপক্ষ

June 2, 2018, 2:45 AM, Hits: 423

আর কত ক্যাবচালকের প্রাণ গেলে শুনবে নগর কর্তৃপক্ষ

হ-বাংলা নিউজ :   আর কত ক্যাবচালকের মৃত্যু হলে নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? আর কত মৃত্যু হলে তাদের দুঃখ ঘোচাতে হাতি বাড়িয়ে দেবে কর্তৃপক্ষ—এসব প্রশ্ন এখন নির্ঘুম নিউইয়র্কের ক্যাবচালকদের। যারা যুগের পর যুগ হলুদ ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে নিউইয়র্ক নগরকে সচল রেখেছেন, তাদের এখন ত্রাহি অবস্থা। গত সপ্তাহে হাডসন নদী থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে কেনি চৌ নামের এক ক্যাবচালকের। 

নগরীর ট্যাক্সিই অ্যালায়েন্স অভিযোগ করেছেন, ঋণের চাপে জর্জরিত হয়েই কেনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। গত পাঁচ মাসে এ নগরে পাঁচজন ক্যাবচালকের আত্মহত্যা এখন আর কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। চরম মানবিক এই সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসার জন্য ট্যাক্সি অ্যালায়েন্সের নেতা ভৈরবী দেশাই নগর কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানিয়েছেন। নিত্যদিন খেটে খাওয়া ক্যাবচালকেরা একের পর সমাবেশ করছেন। নগর ভবনের সামনে ক্ষোভ-দুঃখ জানাতে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন। 

চীনের অভিবাসী কেনি চৌ দুই যুগের বেশি সময় ধরে ইয়েলো ক্যাব চালাচ্ছিলেন। প্রথমে নিছক চালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি নিজেই একদিন ক্যাব চালানোর মালিকানা লাইসেন্স ‘মেডেলিয়ান’ নিলামে কেনেন। নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে নিলামে সীমিত সংখ্যক মেডেলিয়ান বিক্রি করে থাকে। এসব মেডেলিয়ান কেউ কিনেছেন ৩-৪ লাখ ডলারে। কেউ আবার মালিকানার বদল কিনেছেন ১০ লাখ ডলার মূল্যে। নিউইয়র্ক নগর থেকে সব সময় বলা হতো, বিশ্বের সেরা এই নগরীর ট্যাক্সি মেডেলিয়ানে বিনিয়োগ কখনো বৃথা যাবে না। অনেকেই বাড়ি না কিনে নিজের পরিশ্রমের সব সঞ্চয় উজাড় করে মেডেলিয়ান কিনেছেন। 

অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ৫-৭ লাখ ডলারের। কেনি চৌ মেডেলিয়ানের জন্য ব্যাংকের ঋণ নিয়েছিলেন সাত লাখ ডলার। ঋণের বোঝা সামাল দিতে পারছিলেন না কেনি। উবারসহ অন্যান্য অ্যাপসভিত্তিক ট্যাক্সির কারণে হলুদ ট্যাক্সি ব্যবসা লাঠে উঠেছে। আগে দিনে হলুদ ট্যাক্সির এক শিফটে আয় ছিল ন্যূনতম ৪০০ ডলার। এখন পুরো দিন কাজ করেও ১০০ ডলার নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন না ক্যাবচালকেরা। কেনির মতো অভিবাসীরা নিজের জীবনের সব শ্রম ও সঞ্চয় দিয়ে যে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন, তা মিলিয়ে গেছে। কেনির মতো ক্যাব চালকদের তাই স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় আত্মহননের পথ বেছে নিতে হচ্ছে। 

বাংলাদেশি ক্যাবচালক বদরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে ডিভি লটারিতে আমেরিকায় এসেছিলেন। স্বাধীন পেশা হিসেবে ১০ বছর অন্যের ক্যাব চালিয়েছিলেন। নিজের যা সঞ্চয় আর দেশ থেকে জমি বিক্রি করে এনে ২০০৮ সালে মেডেলিয়ান কিনেছিলেন নগরীর নিলাম থেকে। ৪০০ ডলারের এই মেডেলিয়ানের মূল্য বছর বছর বাড়ছিল। ব্যাংক ম্যাডেলিয়নের বিপরীতে ইকুইটি ঋণ দিচ্ছিল। যখন মেডেলিয়ান বিক্রি হচ্ছে ১২ লাখ ডলারে, বদরুল ইসলামের ব্যাংক ঋণ তখন ৬ লাখ ডলার। নিশ্চিন্তে কাজ কর্ম করে সুখের সংসার করছিলেন এই বাংলাদেশি অভিবাসী। ২০১৪ সাল থেকেই মেডেলিয়ানের মূল্য নামতে থাকে। অ্যাপসভিত্তিক ট্যাক্সি নগরীতে আসতে থাকে। মেডেলিয়ানের মূল্য এখন এক লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমেছে। ট্যাক্সির আয় না না থাকায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে পড়েন বদরুল ইসলাম। ছয় মাস আগে ব্যাংকের লোকজন তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ট্যাক্সিসহ মেডেলিয়ান জব্দ করে নিয়ে যায়। ২০ বছরের পেশা থেকে এভাবেই বিতাড়িত হন বদরুল। ঋণের বোঝা আর কর্মহীনতার দায় নিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান সড়ক পথে। 

লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন পঙ্গুত্ব বরণ করা বদরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি জানালেন নিজের জীবনের করুন কাহিনি। বললেন, ‘আমেরিকায় এসে নিজের লেখাপড়া থাকলেও স্বাধীন পেশা ভেবেই ক্যাবচালানোর পেশা বেছে নিয়েছিলাম। সৎ আর কর্মনিষ্ঠা দিয়ে জীবনকে সাজাতে চেয়েছিলাম। ভাগ্য আমাকে প্রতারিত করেছে, আমি এখন চলাচলহীন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে আমেরিকায় এখন সামনে অন্ধকার দেখি।’

বদরুলের মতো এমন কাহিনি অগুনতি। নিউইয়র্কে হলুদ ক্যাব চালানোর পেশায় বাংলাদেশিদের আধিপত্য ছিল। এক সময় চালক হিসেবে কাজে নেমে বহু বাংলাদেশি মেডেলিয়ানের মালিক হয়েছিলেন। এক সময় ইহুদিদের হাতে মেডেলিয়ান বাণিজ্য ছিল একচেটিয়া। এ খাতে বাংলাদেশিদের উত্থানের সময়েই নেমে আসে সংকট। এই সংকট কবে থামবে, কেউ জানে না। 

প্রায় ১৪ হাজার মেডেলিয়ান ছিল নিউইয়র্ক নগরে। এরাই নগরীর প্রাণকেন্দ্রে যাত্রী সেবা দিতেন। নগর কর্তৃপক্ষের নানা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও তাদের আয় রোজগার ছিল রমরমা। এখন উবারসহ অ্যাপসভিত্তিক ৭০ হাজার ক্যাব এই নগরে প্রতিদিন চলাচল করে। যাত্রীদের প্রথম পছন্দ এখন উবার বা অ্যাপসভিত্তিক নিয়ন্ত্রণহীন ক্যাব। 

ট্যাক্সি অ্যালায়েন্স দাবি জানাচ্ছে, নগরীতে ক্যাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা হোক। ভাড়ায় সমতা আনা হোক। নগরের নিজস্ব আইকন হলুদ ট্যাক্সি বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হোক। সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া ব্যাংক বা ঋণ দাতাদের অর্থ আদায়ে কড়াকড়ি না করে কিস্তি সহজ এবং সুদ মওকুফ করা হোক। এর মধ্যে নগরের ট্যাক্সি অ্যান্ড লিমোজিন কমিশন বলেছে, নগরীতে এখন আর নতুন ট্যাক্সি নিলাম দেওয়া হবে না। ফলে চাহিদা কিছু বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। উবারসহ অন্যান্য অ্যাপসভিত্তিক ট্যাক্সির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য আইন করার উদ্যোগ নিয়েছেন রাজ্য জনপ্রতিনিধিরা। 

ট্যাক্সি চালকদের সংগঠন ট্যাক্সি অ্যালায়েন্স বলেছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যুর মিছিল আরও বাড়বে। ট্যাক্সিক্যাব চালকদের আত্মহনন নিউইয়র্কের মতো নগরের লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ