যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব আমেজে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত, প্রেসিডেন্ট দম্পতির ঈদ শুভেচ্ছা

June 17, 2018, 12:05 PM, Hits: 648

যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব আমেজে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত, প্রেসিডেন্ট দম্পতির ঈদ শুভেচ্ছা

ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম : যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব আমেজে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। স্থানীয় সময় ১৫ জুন শুক্রবার মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প এক বিবৃতিতে মুসলিম-আমেরিকানসহ সারাবিশ্বের মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুক্রবার এক প্রেসিডেন্সিয়াল বার্তায় তিনি এ শুভেচ্ছা জানান। বার্তায় প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন যে, এই ঈদ উদযাপন দুনিয়াজুড়ে শান্তি ও শুভ্রতার সুবাস ছড়াবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, মেলানিয়া এবং আমি যুক্তরাষ্ট্র ও সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানদের ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আনন্দ ও ভালোবাসার পুনরাবৃত্তি নিয়ে আসে। এটা ক্ষমাশীলতার চর্চা এবং সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ এনে দেয়।

শুভেচ্ছা বার্তায় প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকার ইতিহাসে ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। আমরা সব মুসলমানের জন্য একটি আনন্দময় ঈদুল ফিতর প্রত্যাশা করি। সকলের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।

এদিকে, নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত মুসলমানগণ স্বপরিবারে নিকটস্থ মসজিদ ও খোলা মাঠে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। প্রায় ২৬ শতাধিক মসজিদ ছাড়াও খোলা মাঠ, কমিউনিটি সেন্টারে এবং বিলাসবহুল হোটেলের বলরুমে অনুষ্ঠিত হয় এসব ঈদ জামাত। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধানা শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ উদযাপন করে বিশেষ আনন্দের উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলসমূহে ঈদের ছুটি থাকায় এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রাজুয়েশন পার্টি সমাপ্তিসহ শিক্ষাবর্ষের শেষ লগ্নে হওয়ায় ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঈদ জামায়াতে যেতে পারায় এবারের ঈদে প্রবাসীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে লোকাল ও গ্লোবাল মুনসাইটিং দ্বন্দ্ব থাকলেও বিগত কয়েক বছর যাবত পবিত্র ঈদুল ফিতর একই দিনে উদযাপিত হয়ে আসছে।

চমৎকার আবহাওয়া থাকায় নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকায় অনেক খোলা মাঠে এবারের ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এবার অধিকাংশ ঈদ জামায়াত সকাল ৮ থেকে সাড়ে ১০ টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ জামায়াত গুলোতে নামে প্রবাসীদের ঢল। সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবেই ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিউইয়র্কে ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় কুইন্সে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের আয়োজনে। খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত এ ঈদ জামায়াতে ১৫ হাজারের অধিক মুসল্লী অংশ নেন বলে আয়োজকরা উল্লেখ করেন। এর পরের বৃহৎ জামাতগুলো অনুষ্ঠিত হয় ব্রঙ্কসে বাংলাবাজার জামে মসজিদ, জ্যাকসন হাইটসে নিউইয়র্ক ঈদ গাঁহ, ওজোন পার্কে মসজিদ আল আমান, এস্টোরিয়ায় আল আমিন মসজিদ, ব্রুকলীনে বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার ও বায়তুল জান্নাহ মসজিদের ব্যবস্থাপনায়।

নিউইয়র্কের উল্লেখযোগ্য ঈদের জামাতগুলোর মধ্যে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার (জেএমসি)-এর উদ্যোগে স্থানীয় জ্যামাইকা হাই স্কুল মাঠে সকাল ৯টায় সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় ব্রঙ্কস বাংলাবাজার জামে মসজিদের উদ্যোগে মসজিদের পাশে খোলা মাঠে বিশাল জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ ষ্ট্রীট ও ব্রডওয়ের কর্ণারে ডাইভারসিটি প্লাজায় নিউইয়র্ক ঈদ গাঁহ’র উদ্যোগে খোলা রাস্তার ওপর ঈদুল ফিতরের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জ্যামাইকার আল আরাফা ইসলামিক সেন্টারের উদ্যোগে স্থানীয় সুসান বি এন্থনী স্কুল মাঠে খোলা আকাশের নীচে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

পার্কচেস্টার জামে মসজিদে সকাল ৮ টায়, সকাল ৯ টায় ও সকাল ১০ টায় ৩টি বড় ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। পার্কচেস্টার জামে মসজিদের প্রথম জামাতে ইমামতি করেন মসজিদের খতীব মাওলানা মোহাম্মদ মাঈনুল ইসলাম।

নর্থ ব্রঙ্কস জামে মসজিদের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ৯ টায় ব্রঙ্কসের ওভাল পার্কে বিশাল ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদের খতীব মাওলানা মাসহুদ ইকবাল জামাতে ইমামতি করেন।

এছাড়া, ইষ্ট এলমহার্স্ট জামে মসজিদ এন্ড মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে স্থানীয় পিএস ১২৭ স্কুলের প্লে গ্রাউন্ডে, কুইন্সের জ্যামাইকার বাংলাদেশ মিশন (হাজী ক্যাম্প) মসজিদ, দারুস সালাম মসজিদ, হিলসাইড ইসলামিক সেন্টার, ফুলতলী ইসলামিক সেন্টার এন্ড মসজিদ, জ্যাকসন হাইটসের জ্যাকসন হাইটস ইসলামিক সেন্টার, মসজিদ আবু হুরায়রা, মোহাম্মদী সেন্টার, ওজনপার্কের আল আমান জামে মসজিদ, দারুস সুন্নাহ মসজিদ, আল ফোরকান মসজিদ, ব্রুকলীনের বাংলাদেশ মসুলিম সেন্টার, বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদ, ম্যানহাটানের মদিনা মসজিদ, আসসাফা মসজিদ, আমেরিকান মুসলিম সেন্টার, এস্টোরিয়ার আল আমীন মসজিদ, গাউছিয়া মসজিদ, ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ইসলামিক সেন্টার, ব্রঙ্কস মুসলিম সেন্টার প্রভৃতি মসজিদের উদ্যোগে খোলা মাঠে বা মসজিদ ভবণে ঈদুল ফিতরের একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া নিউইয়র্কে আরো বেশ কটি ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার ঈদ জামাত

নিউইয়র্কে বাংলাদেশীদের পরিচালনায় অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার (জেএমসি)-এর উদ্যোগে স্থানীয় জ্যামাইকা হাই স্কুল মাঠে সকাল ৯টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লী একত্রে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এই জামাতে ইমামতি, খুৎবা পাঠ ও বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন জেএমসি’র খতিব মাওলানা মির্জা আবু জাফর বেগ। জেএমসি আয়োজিত ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে জেএমসি’র কর্মকর্তা ও মূলধারার রাজনীতিকরা উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।

বাংলাবাজার জামে মসজিদ ঈদ জামাত

নিউইয়র্কে বাঙালী অধ্যুষিত ব্রঙ্কসে বাংলাবাজার জামে মসজিদের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ৮টায় মসজিদের নিকটবর্তী খোলা মাঠে বিশাল জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। এই জামাতে ইমামতি, খুৎবা পাঠ ও বিশেষ দোয়া মুনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাবাজার জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আবুল কাশেম ইয়াহইয়া। ঈদের জামাতের আগে বাংলাবাজার জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ গিয়াস উদ্দিন মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ব্রঙ্কসে বাঙালীদের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র স্টারলিং বাংলাবাজার এলাকায় কোন মসজিদ না থাকায় ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভাড়া বাড়িতে বাংলাবাজার জামে মসজিদের যাত্রা শুরু হয়। পরের বছরের মাঝামাঝি ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার মূল্যে মসজিদের নিজস্ব ভবণ ক্রয় করা হয়। নিজস্ব এ ভবনের ক্লোজিং সম্পন্ন হয় ২০১৩ সালের ৯ আগস্ট। তিনি বলেন, বাংলাবাজার জামে মসজিদ সকলের সহযোগিতায় ব্যাংক ঋৃণ মুক্ত হয়েছে। ব্যাংকের পাওনা ৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার কর্জে হাসানার মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা সম্প্রতি পরিশোধ করা হয়। তিনি জানান, বেইজমেন্ট সহ তিন তলার এ মসজিদ ভবণটি বর্তমানে ব্যাংক ঋৃণ মুক্ত হলেও কর্জে হাসানা মুক্ত তথা সম্পূর্ণ ঋৃণমুক্ত করতে বর্তমানে আরো অনেক অর্থের প্রয়োজন। তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ ঋৃণ মুক্ত করতে সবার সাহায্য সহযোগিতা কামনা করেন। আলহাজ গিয়াস উদ্দিন বলেন, বর্তমানে এ মসজিদে জুমার নামাজে দু’টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তার পরও স্থান সংকুলান না হওয়ায় মুসল্লীদের বাইরে জুমার নামাজ আদায় করতে হয়। ক্রমবর্ধমান মুসল্লীদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে মসজিদটিকে পর্যায়ক্রমে ৬ তলা ভবণে পরিণত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এসময় প্রবাসীদের নিকট বিনীত আবেদন জানান মসজিদে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য। নামাজ শেষে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে মুসল্লীদের ঈদের সেমাই দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

এদিকে, কানাডা ও ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সী, কানেকটিকাট, ম্যারিল্যান্ড, পেনসেলভেনিয়া, ভার্জেনিয়া, ওয়াহিও, ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোরিনা, সাউথ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া, মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, এরিজোনাসহ প্রভৃতি স্টেটে ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব স্টেটে বসবাসকারী বাংলাদেশীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এলাকার মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার ও খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

এদিকে, এদিন অনেকটা ভোরেই মুসলিম পরিবারের সদস্যরা নানা রঙের পাজামা পাঞ্জাবি শাড়ী সালওয়ার কামিজ পরে দল বেঁধে নিকটস্থ মসজিদ কিংবা মাঠে হাজির হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। একত্রে বিপুল সংখ্যক মুসল্লীর ঈদের নামাজ আদায়ের বিষয়টি ভীন দেশীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। ঈদের জামায়াত গুলোতে স্থানীয় রাজনীতিক, সমাজসেবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ  প্রবাসের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ অংশ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের কয়েকজন জাতীয় নেতাও এবার যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উদযাপন করেন।

ঈদের নামাজে কমিউনিটি, দেশ, জাতি ও বিশ্ব মানবতার কল্যাণ সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া মুনাজাত করা হয়। নামাজ শেষে একে অন্যের সাথে আলিঙ্গনের মাধ্যমে পবত্রি ঈদ উল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর সবাই নিজের বাড়ি কিংবা আতœীয় স্বজনের বাড়ীতে ছুটে যান। অনেকে আবার ঈদের নামাজ আদায় করেই কাজে চলে যান। এছাড়া প্রবাসীরা ফোনে বাংলাদেশে স্বজনদের সাথে ঈদ শুভেচ্ছাও বিনিময় করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ঈদের নামাজ আদায়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং  সিটি প্রশাসনের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল লক্ষ্যণীয়। প্রায় প্রতিটি জামাতের আশপাশেই ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদের নামাজ আদায়ের স্থানগুলোর আশপাশের রাস্তায় ফ্রি গাড়ী পার্কিং থাকায় দূর দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লী সপরিবারে ঈদের নামাজে শরীক হন। ঈদ উপলক্ষে নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন এক আমেজ পরিলক্ষিত হয়। 

এদিকে, এবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় অর্ধ লক্ষ প্রবাসী স্বজনের সাথে ঈদ করার জন্যে বাংলাদেশে গেছেন। তাদের প্রায় সকলেই ঈদুল আযহার পর ফিরবেন বলে জানা গেছে। 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ