আম্পায়ার খুশি থাকলে ছক্কা মারবেন ইমরান খান

July 3, 2018, 9:37 AM, Hits: 306

আম্পায়ার খুশি থাকলে ছক্কা মারবেন ইমরান খান

হ-বাংলা নিউজ : ২৫ জুলাই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও শাসনব্যবস্থায় বরাবরই দেখা গেছে জলপাই শাসনের ছায়া। চেষ্টা করেও এ থেকে বের হতে পারছে না দেশটি। প্রথমবারের মতো দুটি গণতান্ত্রিক সরকার মেয়াদ পূর্ণ করেছে। সেই দেশের আসন্ন নির্বাচনে এবার ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খানের দিন আসছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। বলা হচ্ছে, রাজনীতির মাঠে ছক্কা হাঁকাবেন ইমরান। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের হালচাল সে কথাই বলছে। ২২ বছর ধরে রাজনীতির মাঠে থাকা ইমরানকে নিয়ে এহেন স্বপ্নের কারণ সেনাবাহিনী। ভোটের বাজারে কানাঘুষা, ইমরান-সেনাবাহিনী এবার ‘মানিকজোড়’। পাকিস্তানের নির্বাচন নিয়ে গার্ডিয়ানও এক বিশ্লেষণে এমন আভাসই দিয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের মতো’ করে নির্বাচনে সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই সেনাবাহিনীকে ‘আম্পায়ার’ আখ্যা দিয়ে বলা হচ্ছে, এদের হাতে রাখতে পারলেই পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হয়ে বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বোল্ড করে ব্যাটিংয়ে ছক্কা হাঁকাবেন। আর এটা ঘটলে তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর হাতেই প্রাণ ফিরে পাবে নয়া পাকিস্তান।

২২ বছর ধরে ‘নতুন পাকিস্তান’-এর জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ইমরান। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নতুন কিছু নয়। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে (পিপিপি) পরাজিত করতে বিরোধী দলগুলোকে অর্থ দিয়েছিল সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব খাটানোর নানা আলামত আগেই পাওয়া গেছে। এখন সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে।

এখন ইমরান খান পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে তিনি ‘আম্পায়ারদের’ মন রাখতে বা পছন্দের কি না, তা-ই আগামীর বিবেচ্য বিষয়। নির্বাচনের ঘণ্টা বেজে গেছে। ২৫ জুলাই ভোটের দিন তাঁর ফল ভালো হওয়ার কথা।

৩০ জুন গার্ডিয়ানের প্রতিবেদক মেমফিস বার্কার লাহোরে ইমরানের বাসার সামনে ছিলেন। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান থাকেন লাহোরে। তাঁর বাড়ির সামনেই চা-সমুচার দোকানের ভিড় করছেন কিছু ভক্ত। তাঁরা ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্মৃতি ও গৌরব নিয়ে কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন, অধিনায়ক ইমরানের বলে ইংল্যান্ডের শেষ উইকেট পড়ে যায়। পাকিস্তান মেতে ওঠে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে। ফাইনালে ইমরানের হাতে ট্রফি ও সেই জয়ের সেই স্মৃতি মনে করে ভক্তদের একজন ইমরান রাজা বলছিলেন, ‘ইমরান খান বাঘের মতো ছিলেন।’ ২১ বছর বয়সী হাসান বলছিলেন, ‘আমি এখনো ইউটিউবে সেই ম্যাচ দেখি।’

১৯৯৬ সালে ইমরান রাজনৈতিক দল পিটিআই প্রতিষ্ঠা করেন। নির্বাচন উপলক্ষে লাহোরের রাস্তায় শোভা পাচ্ছে পিটিআইয়ের পোস্টার। পোস্টারের দলের লোগো, ব্যাট এবং বল আছে। নির্বাচনের জন্য মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ৬৫ বছরের ইমরান। গত বৃহস্পতিবার লাহোরে এক সমাবেশে দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের সতর্ক করে দিয়ে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়ে ইমরান খান বলেছেন, ‘শেষ বল না হওয়া পর্যন্ত থামা যাবে না।’

বিভিন্ন জরিপে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএলএল-এন) আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক পূর্বাভাস দিয়েছেন যে পরাজয়ের প্রবণতা, আদালতের মামলা এবং সামরিক বাহিনীর চাপ সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দলকে পরপর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে হয়তো দেবে না।

তবে বিনা স্বার্থে পাকিস্তানের কোনো দলকেই বুকে টানেনি সেনাবাহিনী। তাহলে ইমরানের পক্ষে কেন? বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা নওয়াজের পিএমএল-এনের মতো প্রভাবশালী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেনাবাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয়। আর তাই তৃতীয় শক্তি হিসেবে তেহরিক-ই-ইনসাফের মতো চারাগাছকে ক্ষমতায় বসাতে চায় সেনাবাহিনী। খেলার মাঠ ছেড়ে রাজনীতির মাঠে নামার পর থেকেই ‘সেনা হাতিয়ার’-এর কলঙ্ক ইমরানের শরীরে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, তা আরও চাঙা হচ্ছে। অনেকেই ধারণা, এবার ইমরানের কাঁধে বন্দুকের নল রেখে ‘পাখি’ শিকার করবে সেনাবাহিনী।

এবারের নির্বাচনে নওয়াজের পিএমএল-এনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়েছে ইমরানের পিটিআই। প্রতিপক্ষ কুপোকাত করে ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও জোরদার হয়েছে। কারণ, নির্বাচনে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সেনা মোতায়েনের যে সিদ্ধান্ত, তাতে সায় রয়েছে ইমরানের। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দীর্ঘদিনের বাসনা পূর্ণ করতে জোর প্রচারণাও চালাচ্ছেন ইমরান। এমনও জানা গেছে, ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মতো আচরণ শুরু করে দিয়েছেন তিনি।

সেনাবাহিনীর চাওয়া পূরণ হবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। সবকিছু নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও ভোটারের মন তো আর সেনা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। নওয়াজের প্রতি সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের আচরণে তাঁর প্রতি জনগণের সহানুভূতি আবার বাড়ছে বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। গ্যালাপের ওয়েবসাইট বলছে, সবার চেয়ে এগিয়ে আছে নওয়াজের পিএমএল-এন (৩৮শতাংশ)। তার পরেই আছে ইমরানের পিটিআই (২৫শতাংশ); তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জারদারি-বিলাওয়ালের পিপিপি (১৫ শতাংশ)। জাতীয়ভাবে নওয়াজ ইমরানের চেয়ে ১৩ শতাংশ এগিয়ে থাকলেও নিজের ঘাঁটি পাঞ্জাবে এগিয়ে আছেন ২০ শতাংশ। নওয়াজের দলের ইভেন্টগুলোয় জনসমাগমও হয় অন্য দলগুলোর চেয়ে বেশি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাহোরের যে এলাকা থেকে ইমরান লড়াই করছেন, সেই এলাকার একটি রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করে আছেন মেহরিন ও তাঁর স্বামী ইয়াসির। সেখানে পিএমএল-এনের সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁরা বলছিলেন, ‘ইমরান খান একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পাকিস্তানের জন্য একমাত্র আশা।’

কে জিতবেন, তা এখন বলা মুশকিল। চলতি বছরে পাকিস্তানে অর্থনীতির অবস্থা টালমাটাল, মূল্যস্ফীতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের সহায়তাও প্রয়োজন দেশটির। অর্থ পাচারসংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পাকিস্তানকে ‘ধূসর তালিকা’ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ, সন্ত্রাসবাদের আর্থিক সাহায্যের ক্ষেত্রে তারা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

২০০৬ সালে ইংল্যান্ড ফিরে আসার পর ইমরান তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্লেবয় খ্যাতি বাদ দিয়ে রাজনীতির মাঠে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। বিয়ে করেন জেমিমা গোল্ডস্মিথকে। স্যুট-বুট ছেড়ে এখন তিনি পাঞ্জাবি-পায়জামা (সালোয়ার-কামিজ) পরেন। জেমিমার পর রেহাম খানের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধলেও তা টেকে মাত্র ১০ মাস। এ বছরের শুরুতে তাঁর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা বুশরা মানেকাকে বিয়ে করেন। সমর্থকদের কাছে ইমরান খান রাজনীতিবিদের পাশাপাশি একজন মানবপ্রেমিকও। ক্যানসারের তিনটি হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। তার অর্থনৈতিক অবস্থা পিএমএল-এন প্রতিষ্ঠাতা নওয়াজ শরিফ এবং তাঁর পরিবারের মতোই। নওয়াজ শরিফ ও তাঁর পরিবার অর্থ পাচার মামলায় বিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত বছর ইমরান খান পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নামা আসা নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। এরপরই নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার যোগ্যতা হারান। পরে সরে যান। ৪০ বছর বয়সী প্রযুক্তিকর্মী রাহিল মালিক বলেন, ‘ইমরান খান একজন সৎ ব্যক্তি। তিনি যা বলেন, তা-ই করার চেষ্টা করেন। এ জন্য তাঁকে একটিবার সুযোগ দেওয়া উচিত।’

টেলিভিশন উপস্থাপক ফাসি জাকা গার্ডিয়ানকে বলেন, পিটিআই চেয়ারম্যান গত নির্বাচনে একটু কম আস্থাশীল ছিলেন। ‘গতবারের প্রচারের দিকে তাকালে দেখবেন, লক্ষণীয় বিষয় হলো, পিটিআই ২০১৩ সালে সেভাবে প্রচারে নামেনি। তরুণ ও মধ্যবিত্তের ভোট পেয়ে ইমরান খানের দল পার্লামেন্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়ে যায়। অংশত সেটাই ইমরানের পথ প্রশস্ত করেছে।’

ইমরান খান দেশটির জনগণকে ‘নতুন পাকিস্তানের’ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আর অনেকেই এতে আশাবাদী। কারণ, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে তাঁর দলের সরকার পাঁচ বছরে সাফল্যর সঙ্গে জনকল্যাণে কাজ করেছে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা বেড়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়েছে।

পাকিস্তানের অন্যতম একজন কনসালট্যান্ট উমর জাভেদের মতে, ইমরান খান প্রতিষ্ঠানবিরোধী গুজব উপভোগ করেন। পাঞ্জাবের রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা ব্যাপক। তিনি ভালো করতে পারেন—এটা মানলেও মানুষের বিশ্বাস, তাঁর পেছনে আছে সেনাবাহিনী। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ