থাইল্যান্ডের গুহায় আবারো অভিযান শুরু

July 9, 2018, 1:27 AM, Hits: 342

থাইল্যান্ডের গুহায় আবারো অভিযান শুরু

হ-বাংলা নিউজ :  থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া শিশু-কিশোরদের উদ্ধারে আবারো অভিযান শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলে এসেছে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স। আজ সোমবার দ্বিতীয় দফায় এ অভিযান শুরু হলো।

এর আগে রবিবার থাইল্যান্ডসহ আন্তর্জাতিক ডুবুরিদের একটি দল রুদ্ধশ্বাস অভিযানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চার কিশোরকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া কিশোরদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন চিকিৎসকরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, কিশোরদের উদ্ধারে থাই সরকারের সঙ্গে একত্রে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, উদ্ধার অভিযান প্রভাব ফেলতে পারে আগামী বছরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে। 

রুদ্ধশ্বাস অভিযান

থাম লুয়াং নামের এই গুহাটির কোথাও কোথাও ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু, কোথাও কোথাও অত্যন্ত সরু আবার কোথাও কোথাও সেটি পানিতে পূর্ণ। গুহাটির ভেতর থেকে বাচ্চাদের বের করে আনার  কাজটা কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে সেটা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠে একজন উদ্ধারকারী ডুবুরির মৃত্যুর ঘটনায়। থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ১০টায় বন্যাকবলিত গুহায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। অভিযানের প্রধান এবং চিয়াং রাই প্রদেশের গভর্ণর নরোংস্যাক জানিয়েছেন, ৯০ জন ডুবুরি অভিযানের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের ৪০ জন এবং ৫০ জন বিদেশি। বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে প্রথম কিশোরকে গুহা থেকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। উদ্ধারকারী মূল দলে ১৩ জন বিদেশি এবং থাই নেভি সিলের ৫ জন সদস্য রয়েছেন। রাতে রবিবারের মতো উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আজ সোমবার ফের উদ্ধার অভিযান শুরু হবে। গতকাল অভিযান শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্ণর বলেন, শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নিরাপদে চারজন কিশোরকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের চিয়াং রাইয়ের প্রচানুকোরোহ হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন চিকিত্সকরা। তারা সুস্থ আছে। তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। তিনি জানান, ধারণার চেয়ে কম সময়ে অভিযান সম্পন্ন করা গেছে। দশ ঘন্টার জন্য অভিযান স্থগিত করা হয়েছে বলে গভর্ণর জানান। কিশোরদের মুখে মাস্ক পরানো হয়েছিল।

একেকজন কিশোরকে দু’জন করে ডুবুরি তাদের তত্ত্বাবধানে বের করে আনেন। পুরো পথ পার হতে অন্তত ছয় ঘন্টা লাগে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আটকে পড়া বাকি ৯ জনকে আজ কিংবা কালকের মধ্যে বের করে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ঝুঁকির কথাও অস্বীকার করছেন না কর্তৃপক্ষ।

কেন গুহার ভেতরে

কিশোর ছেলেরা ফুটবল অনুশীলন করতে ২৩ জুন সকাল দশটার দিকে ন্যাশনাল পার্কে গিয়েছিল। তারপর তাদের সহকারী কোচ একাপোল ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিও পোস্ট করেছিলেন সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে। থাম লুয়াং-খুনাম নাঙ্গনন ন্যাশনাল পার্কের একজন কর্মী দুপুর তিনটার দিকে লক্ষ্য করেন যে গুহার প্রবেশ মুখের সামনে ১১টি সাইকেল। তারা অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তারপর ওই কিশোরদের একজনের পিতামাতাও ন্যাশনাল পার্কের কর্মকর্তাদের জানান যে তারাও তাদের ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। পরদিন একটা থেকে তাদের খোঁজার কাজ শুরু হয়। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়, অনুশীলন শেষ হওয়ার পর ফুটবলের দলের একজন সদস্যের জন্যে সারপ্রাইজ পার্টির আয়োজন করতে তারা গুহার ভেতরে ঢুকেছিল বলে ধারণা। পরে গুহার ভেতর থেকে পাঠানো এক চিঠিতে সহকারী কোচ একাপোল তার আত্মীয়দেরকে দুশ্চিন্তা না করতে অনুরোধ করেছেন, সহযোগিতার জন্যে তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন বাচ্চাদের পিতামাতার কাছে।

কীভাবে আটকা পড়লো

ফুটবল দলটি গুহার ভেতরে ঢোকার পর থেকেই প্রচুর বৃষ্টি হতে শুরু করে। জমে যাওয়া জঙ্গলের পানিও ঢুকে যায় গুহার ভেতরে। পানি এতো বেড়ে যায় যে এক পর্যায়ে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যায়। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা খুব দ্রুত বেড়ে গেলে কোচসহ কিশোর ফুটবলাররা ভেতরে আটকা পড়ে। আরো উঁচু জায়গা খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে যায় গুহার আরো গভীরে। থাম লুয়াং গুহা ১০ হাজার ৩১৬ মিটার লম্বা এবং থাইল্যান্ডে যতো গুহা আছে, দৈর্ঘ্যের বিচারে এটি চতুর্থ। থাই নৌবাহিনীর সাবেক একজন অভিজ্ঞ ডুবুরি তিনদিন আগে গুহার ভেতরে বাচ্চাদের কাছে অক্সিজেনের ট্যাঙ্ক পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার সময় মারা যান। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু ৯ দিন পর জানা যায় যে তারা জীবিত আছে। এরপর তাদের খাবার, অক্সিজেন এবং ঔষধ সরবরাহ করা হয়।

গুহাটির বিষয়ে লোক-কাহিনী

গুহাটি নিয়ে অনেক গল্প। একটি গল্পে বলা হয়েছে এর নাম কীভাবে ‘থাম লুয়াং-খুন নাম নাং নন’ হলো? এর অর্থ-‘পাহাড়ের ভেতরে বিশাল এই গুহায় ঘুমিয়ে আছেন একজন নারী। এই পাহাড়েই জন্ম হয়েছে এক নদীর’। গল্পটিতে বলা হয়-দক্ষিণ চীনের চিয়াং রুং শহরের এক রাজকন্যা একজন অশ্বারোহী পুরুষের সাথে সম্পর্কের পর গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তারা তখন সমাজের ভয়ে ভীত হয়ে শহর থেকে পালিয়ে দক্ষিণের দিকে চলে আসেন। যখন তারা এই পাহাড়ি এলাকায় এসে পৌঁছান তখন রাজকন্যার স্বামী তাকে বলেন সেখানে বিশ্রাম নিতে। স্বামী খাবারের সন্ধানে বের হয়ে যান। তখন রাজকন্যার পিতার লোকেরা তাকে দেখতে পায় এবং তাকে হত্যা করে। রাজকন্যা যখন নিশ্চিত হন যে তার স্বামী আর ফিরে আসবে না তখন তিনি তার চুলের একটি ক্লিপ নিজের পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার মৃতদেহ তখন একটি পর্বতে পরিণত হয় এবং তার শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছিল সেটা প্রবাহিত হয়ে ‘নাম মায়ে সাই’ নামের এক নদীর জন্ম হয়।

আরো যারা হারিয়েছিল

স্থানীয় বান জং গ্রামের একজন নেতা বলেছেন, ১৯৮৬ সালে এই গুহার ভেতরে একজন বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ হয় এবং তাকে উদ্ধার করা হয়। চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও ২০১৬ সালের আগস্টে মাসে ওই গুহার ভেতরে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন বলে বলা হচ্ছে। তিন মাস তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ