আমরা তো ভেতর থেকে বদলাইনি

August 7, 2018, 9:05 AM, Hits: 261

আমরা তো ভেতর থেকে বদলাইনি

হ-বাংলা নিউজ : আমার মনে হচ্ছে কিছুদিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ করে দিই। এমনকি সংবাদপত্র পড়াও। আমার নার্ভ সম্ভবত খুব দুর্বল—এই ছবি, ভিডিও, গুজব, সত্য কিছুই আর নিতে পারছি না। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এই যে আন্দোলন, আমি এর সঙ্গে আবেগ আর নীতিগতভাবে একমত। এখনো একমত। কিন্তু যে পরিস্থিতি দেখছি সত্য-মিথ্যা যাই হোক, ছাত্রদের ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় এখন। কারণ, এখন আমাদের বুড়ো খোকাদের ফকিন্নি নীতি আর নোংরামি শুরু হয়ে গেছে। তাদের এই নোংরামির বলি আমাদের সন্তানরা আর কত হবে? রাস্তায় হারিয়েছি আমরা আমদের বাচ্চাদের। আর তো আমরা তাদের হারাতে চাই না।

এই আন্দোলন তো শুরু হয়েছিল আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য, রক্তাক্ত করার জন্য নয়। আমার জন্মের পর যতগুলো বড় আন্দোলন আমি দেখেছি, সবগুলোতেই অংশগ্রহণ ছিল ছাত্র আর সাধারণ মানুষের। নব্বইয়ের আন্দোলন, ছিয়ানব্বইয়ের ৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আন্দোলন, ২০১১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবসানের আন্দোলন—যেটাই মনে পড়ে, সবগুলোতেই ছিল আমাদের ছাত্ররা আর সাধারণ মানুষ।

এসব আন্দোলন কিন্তু ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ার কভারেজ পায়নি কখনো। তখন ছিলও না এসব এত কিছু। কিন্তু আন্দোলন সংগঠিত হতে কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছিল এসব আন্দোলনে। পুলিশ তখনো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিল না কিন্তু। এখন যেমন বলা হচ্ছে সরকার সমর্থকেরা আন্দোলনে বাধা দিচ্ছে, তখনো বাধা দিয়েছে তখনকার সরকার সমর্থকেরা। কিছুতেই কিছু থেমে থাকেনি।Eprothomalo

এখন বরং এটা আরও নোংরা। কে যে কোথায় ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে? আজ দেখলাম একটা ভিডিও, যেখানে কিছু ছেলে ইউনিফর্ম পরছে রাস্তায়। এই একটা ভিডিও একেকজনের ওয়ালে তাদের নিজেদের সুবিধামতো ক্যাপশনে ব্যবহার করা হচ্ছে। হয়তো এমনও হতে পারে, ছেলেগুলোর বাবা-মা অনুমতি দেবে না রাস্তায় নামার জন্য, তাই তারা বাসার বাইরে এসে ইউনিফর্ম পরছে। কোনো দলেরই না হয়তো ছেলেগুলো। এটা শুধু একটা ধারণামাত্র আমার।

কিন্তু এই যে আমাদের ফেসবুক নোংরামি, সেটা খুবই ভয়ংকর। আমি আসলে হতাশ এই ফেসবুক বেইজড আন্দোলন অ্যাকটিভিস্টদের এসব পোস্টে। এই শ্রেণির মানুষ যারা সারাক্ষণ তাদের ফেসবুক ওয়াল গরম করে রাখছেন বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দিয়ে, তারা আসলে ফেসবুককে ব্যবহার করছেন নিজেদের বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের বাস্তবায়নের জন্য। আরেক শ্রেণির মানুষ আছেন, যারা খুবই আবেগতাড়িত কিংবা প্রভাবিত হচ্ছেন যেকোনো ধরনের পোস্ট দেখে। এই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ কোনো কিছু যাচাই বাছাই করছেন না। তারাও অনেক সময়ই পক্ষপাতদুষ্ট। মনের গহিনে (সবাই না)। বিভিন্ন শ্রেণির এই মাল্টি ডাইমেনশনাল উদ্দেশ্য পুরোটাই এখন ব্যক্তিগত আগ্রহ আর রাজনৈতিক আদর্শের বহিঃপ্রকাশ।

আজকে একটা ভিডিও দেখালাম, যেখানে একজন ফটোগ্রাফারকে দাবড়ে মারছে ৮-১০টা ছেলে আর রাস্তার ডিভাইডারের ওপর দাঁড়িয়ে ভিডিও করছে কমপক্ষে ৫০ জন মানুষ। আরও কিছু মানুষ দৌড়ে আসছে রাস্তা পার হয়ে মার দেওয়া দেখতে। এই যে লোকগুলো ভিডিও করা আর তামাশা দেখা নিয়ে যে এত ব্যস্ত ছিল, এদের অর্ধেকও যদি দৌড়ে নামত ছেলেগুলোকে বাধা দিতে, তাহলে কি ছেলেটা মার খেত? এই হলো আমাদের বিবেক, আমাদের মানবতা।

সেই ভিডিও পোস্টের নিচে অনেকের কমেন্টসই আমি পড়েছি। সেখানে যারা মারছে তাদের নিয়ে কত কথা! কিন্তু আমার অভিযোগের আঙুল তো দর্শকসারির দিকে। আমরা আজকে সত্যি বিভক্ত। আমাদের মনুষ্যত্ব কাজ করছে না। আমরা তো ভেতর থেকে বদলাইনি। এত কিছু দেখাশোনার পরও না।

এই যে বাচ্চাগুলো রাস্তায় নেমেছে আর আন্দোলন করছে, তা কার জন্য? শুধুমাত্র তারা নিজেরা নিরাপদে থাকবে বলে, নাকি সবার জন্য? এটা শুধু তাদের দায়? বাকি কারও না? আমরা ক্রিমটা খাব, যদি ক্রিমটা অন্য কেউ বানিয়ে দেয় তাহলেই। আজকে দেখি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। কোথাও কোথাও ক্লাসও দেখলাম বন্ধ। এ ছাড়া সড়ক অবরোধ।

নিজের মনেই হাসলাম। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা যেটা অনুধাবন করল সাত দিন আগে সেটা কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুধাবন করতে এত দিন লেগে গেল? ভেবে দেখলে একদিক থেকে ঠিকই আছে। বয়স যত বাড়ে এ দেশে, বোধ তত কমে। স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাচ্চারা একটু পেছনে (আমি শঙ্কিত আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা না আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বসেন, আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন)। তাদের চেয়ে আরও পেছনে অভিভাবকেরা। আর তাদের চেয়েও পেছনে আমাদের রাজনৈতিক নেতা আর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

এই দেশে একটা ধারণা প্রচলিত আছে বলেই আমার মনে হয় যে, ছাত্ররা চাইলে সরকার নামিয়ে দিতে পারে। এটা সত্যি। সারা পৃথিবীতেই ছাত্ররা একটা বড় শক্তি। তারা অনেক কিছুই করতে পারে। আমরা কি এখন তাহলে আমাদের ছাত্রশক্তিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাচ্ছি? প্রধানমন্ত্রীর কথা আমিও বিশ্বাস করি, আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ এসে গেছে। সেই তৃতীয় পক্ষ যে যার সুবিধামতো মনে করে নিচ্ছে।

আমি এত কিছু বুঝতে চাই না কিংবা এই নিয়ে বিতর্কেও যেতে চাই না যে, কে এই তৃতীয় পক্ষ। আমি চাই আমার বাচ্চারা ঘরে ফিরুক নিরাপদে। এই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পক্ষের কচকচানি আমি আর শুনতে চাই না। আমি চাই, বাচ্চারা একবার তাদের বাবা-মাদের বিশ্বাস করুক। আমাদের প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা কর্মরত বা প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা সবাই এদের বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামি, ভাই কিংবা বোন। সবার ওপর থেকে যদি আমাদের বিশ্বাস উঠেও যায়, তখনো নিজের পরিবারের ওপর বিশ্বাস যেন অটুট থাকে।

একবার নিজের পরিবারকে সুযোগ দিক। শুদ্ধতার অভিযানটা শুরু হোক নিজ বাড়ি থেকে। সেখানে যেন একজন বাবা, একজন ভাই, একজন বোন কিংবা একজন মা নিজের সন্তানের সামনে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়াতে পারেন চোখে চোখ মিলিয়ে। বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে কিংবা যেকোনো কাজে যাওয়ার সময় যেন সবাই নিজের সন্তানের আবেগকে মনে রাখেন। মন থেকে যেন অনুধাবন করেন সন্তানের ত্যাগ, বন্ধু হারানোর বেদনা আর একটা স্বপ্নের দেশে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

মনে রাখা দরকার, সন্তানের কাছে পরিবারই হলো মূল্যবোধ শিক্ষার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। বাচ্চারা তো অনেক শেখাল, অনেক করল। এবার তাদের নীড়ে ফেরার সময়। কিলিয়ে কাঁঠাল না পাকিয়ে নিজেরদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা শুরু করি আমরা। বাবারা তোমরা ঘরে ফিরে যাও। আমাদের অক্ষমতা থেকে বের হওয়ার একটা সুযোগ দাও। কারও স্বার্থে ব্যবহৃত আর আমরা হব না বলে, যেন সচেতন হই আর রুখে দিই সব ধরনের অপশক্তি।

দয়া করে একে কেউ রাজনৈতিক পোস্ট বানাবেন না বা রাজনৈতিক মন্তব্য করবেন না। এটা আমার একান্ত নিজস্ব ভাবনা। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ