সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ

August 24, 2018, 12:09 PM, Hits: 234

সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ

এই যে আমরা যারা প্রবাসে জীবন কাটাই, তাদের বেশির ভাগই পরিবার পরিজন দেশে রেখে থাকি এই অকুল পাথারে। নিশ্চিত জীবন কাটাতে চলতি পথে হাসি হাসি মুখ করে সামনে যে বাঙালিকেই পাই জন্মের ভাইবোন বানিয়ে ফেলি বা বানাই অকাট্ট বন্ধু। পরিবারের মমতার অভাব মেটাতে উপ্পুত করে ঢেলে দিই সকল ভালোবাসা। জমা দিয়ে দিই বিশ্বাসটাও। আর তড়িৎগতির এমন কাজই অস্থিতিশীল জীবনে হয় যত গন্ডগোলের মূল!

প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। তাদের চিন্তা-চেতনা, মন মানসিকতা, ধারণ বাহন সবই আলাদা আল্লাহর প্রদত্ত নিয়মে। সবাই সবার বন্ধু হতে পারে না ঠিক এ কারণেই। মানুষের বন্ধুত্বগুলো হয় এই বুঝে যে, আচ্ছা এক শ ভাগ মনের মিল হবে না, কিন্তু ৬০-৭০ ভাগ মিলতো আছে। তাই পায়ে-পায়ে পথ চলা যায়। এমন সম্পর্কটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণতা পায়। দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য হয়। কিন্তু যেখানে মানসিকতা—‘তুমি উত্তর ভাবো তো আমি দক্ষিণ ভাবি’ এমন হয়, সে সম্পর্ক যতই আপনি ১০০ কিলোমিটার বেগে গড়তে যান না কেন দুই মাস যেতে না যেতেই তা কালবৈশাখী ঝড়ে মুখ থুবড়ে পরতে বাধ্য। আর দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের প্রবাসী জীবনে এই হিসাব নিকাশের ধার ধারি না বলেই আমরা অহরহ দিচ্ছি চরম মাশুল। ব্যস্তসমস্ত জীবনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে রাখছি আমরা নিজেরাই। আবার সেই দুঃখ-বিড়ম্বনা নিয়ে হাপুস নয়নে বসে কাঁদছি এই আমরাই। অথচ একটু সচেতন হলে এমন ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলা যেত সহজেই।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই মাথাভর্তি বুদ্ধি গিজগিজ করাই স্বাভাবিক। মানুষ ভাবে এই বুদ্ধিকে ধারের ওপর রাখতে হবে। প্রতিনিয়ত কাজে লাগাতে হবে। যারা সমস্যায় জীবন কাটায়, তাদের বুদ্ধি কাজে লাগাতে হয় নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য। অন্য কারও দিকে তাকানোর সময় কোথায় তার? কিন্তু যারা সুখে আছেন তাদের যে ভূতে কিলায় তা বলাই বাহুল্য। তারা তখন নেমে পড়েন কোন ভাবি কীভাবে কথা বলেন; কোন আপা/ভাবি দাওয়াত কম দেন; কোন ভাই দাওয়াতে জ্ঞানের দরজায় শান দেন; কার সন্তানটা বেয়াদব। কে, কেন, কীভাবে কেমন গাড়িটা কিনল, জীবাণু ছড়ানোর মতো তা ছড়িয়ে বেড়াতে।Eprothomalo

‘এই নিয়েছে ওই নিল যা, কান নিয়েছে চিলে’ শোনা মাত্র চিলের পেছনে ছোটা বাঙালির সহজাত বৈশিষ্ট্য। কী শিক্ষিত, কী বুদ্ধিজীবী, কী অভিজাত বংশধর—এ রোগে আক্রান্ত সিংহভাগ বাঙালি। তাই ব্যস, কিছুদিন আকাশ বাতাস গরম করে ধূলিঝড় বয়ে চলে ভুক্তভোগীদের জীবনের ওপর দিয়ে। ভালো মনের মানুষেরা খুব সহজেই এই দুষ্টচক্রে পা ফেলে। বুঝতেও পারে না তাদের মূল্যবান সময় চুরি হতে চলেছে। ঝড় থামে একসময়—জীবনের টানাপোড়েন সব ভুলিয়ে দেয় যথারীতি। এভাবেই চলতে থাকে এই প্রবাসী জীবনচক্র।

এসব দেখতে দেখতে বড্ড ক্লান্ত আমি খেয়াল করে ভাবতে বসি সমাজে যে একবার এই নাটকের দর্শক আরেকবার সে-ই অভিনেতা-অভিনেত্রী। আজ যে অপরাধীর কাঠগড়ায় কাল অন্য কোনো ঘটনায় সে-ই আবার বিচারকের আসনে। কেন হয় এমন? সম্পর্কগুলো কেন কচুর পাতায় পানি ধরে রাখার মতো এত কঠিন আর কষ্টকর? চলুন মিলিয়ে দেখি আমার মতের কারণগুলোর সঙ্গে আপনারটা মিলে যায় কিনা।

পরিবারকে কাছে না পাওয়ার অতৃপ্তি মানুষকে অসহিষ্ণু করে

প্রবাস জীবনে বিশুদ্ধ বাতাস, নির্ভেজাল খাবার, দামি ব্রান্ডের পোশাক, ঝকঝকে গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি সবইতো পাই আমরা কষ্টার্জিত টাকায়। কেন যেন তবু বিনি সুতোর মালাটা গাঁথা হয় না আনন্দে। বুকটা খাঁ খাঁ করে মা-বাবা, ভাই-বোনের আলিঙ্গন, হালকা খুনসুটিগুলো আর পাওয়া হয় না বলে। ভীষণ আনন্দের দিনে বা চরম দুঃখের দিনে এই মানুষগুলোর ছোঁয়া ছাড়াই আমাদের জীবন পার করতে হয়। এই অতৃপ্তি আমাদের অসহায় বানায় যার ক্ষোভ গিয়ে পরে সামাজিক জীবনে।

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারার ব্যর্থতার ক্ষোভ

পাহাড়সম স্বপ্ন নিয়ে শিকড় ছিঁড়ে পাড়ি জমাই আমরা উন্নত বিশ্বের যেকোনো দেশে। নিজের যোগ্যতার ওপর অগাধ আস্থা থাকলেও বাস্তবটা বেশির ভাগ সময়ই পরিবেশ দ্বারা পরিচালিত হয়। অন্যের দেশে এত সহজে স্বপ্নের চূড়ায় উঠি যে সম্ভব না, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মাশুল গুনে বুঝি। শ্রম ও ভাগ্যের সমন্বয়ে যদি আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাইও বা, তখন নিজেকে অন্য রেখার মাপকাঠিতে মাপতে শুরু করি। পরিণতিতে অহংকারে যেন পা মাটিতে পড়ে না। সমাজে পাশের মানুষকে ‘ধরাকে সড়া জ্ঞান’ করতে ভুলি না। আবার যারা স্বপ্নের চূড়া থেকে মুখ থুবড়ে পড়েন তারা ব্যর্থতার বোঝা বইতে না পেরে তা চাপান সহযাত্রী বেচারাদের ওপরেই। নানাভাবে ত্যক্ত বিরক্ত করেন সমাজের আর সবাইকে। টার্গেট স্থির করে হাতিয়ার হিসেবে ‘মুখবই’ (face book) ব্যবহার করে খুব সহজেই শত্রুকে জালে আটকে ফেলা যায়। তবে যাই বলেন, মুখবই বলেই মানুষের মানসিকতার ধরন লোকচক্ষুর আড়ালে আর কেউ চেপে রাখতে পারছে না। কার ব্যক্তিত্ব কেমন তা সহজেই ধরা পড়ছে। সম্পর্কের লেজেগোবরে অবস্থার হয় করুণ পরিণতি!

কাছে বা সমকক্ষের মানুষের সঙ্গে অলিখিত প্রতিযোগিতার মনোভাব

কথায় আছে ‘আমরা সব সময় প্রতিবেশীর চেয়ে ভালো থাকতে চাই’। অর্থাৎ আমাদের যোগ্যতা বা সক্ষমতা আমরা অসীম সীমারেখায় ভাবার চেয়ে কাছের মানুষদের সমান রেখায় রাখি। তাই রান্নার হাঁড়ি ঠোকাঠুকির মতো অহরহ সহজ টার্গেটটা স্বজাতি পাশের লোকটিই হয়। অমুক যে কাজ করে বা যে গাড়ি চালায় আমাকেও তাই করতে হবে। এর চেয়ে বেশি করতে পারলে বোনাস। সে তখন আবার হইচই করে বলবে তা কেন, তা কেন আমার মতো চাই কেন? এমন যখন হাল তখন কেউ বিপদে পরলে বলাই বাহুল্য কেউ সাহায্যতো তেমন করেই না বরং একে অপরের প্রতি সম্মানটাকেও কবর দিয়ে ফেলে।

অতিরিক্ত কাজের চাপে মানসিক শান্তি না থাকা

স্বপ্নের পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে আমরা যে ঘোড়দৌড় শুরু করি, তাতে অনেকেরই দিগ্‌বিদিক তাকানোর সময়তো দূরের কথা, নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়টুকুও বের করতে পারে না। অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপে এমন অবসন্ন থাকে যে, সামাজিক কোনো আড্ডায় কারও কথাই সুবিধার মনে হয় না। সবাইকে অবিশ্বাসী আর স্বার্থপর মনে হয়। সমাজে নিজেদের কর্তব্য নিয়ে ভাবতে পারে না, কারণ তারা তখনো নিজেদের অপার্থিব জগতের বাসিন্দা বানিয়ে শূন্যে ভাসতে থাকে। এই কোনো কিছুতেই কিছু আসে-যায় না কিসিমের মানুষগুলোর জন্য আমার বড্ড মায়া লাগে। কথা বলে ভাবনাগুলো তাদের মনে গাঁথার চেষ্টা করতে গিয়ে ভাবি, এদের সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ লাগাই কোথায়!

প্রতিনিয়ত নিজের অযোগ্যতাকে বিপৎসংকুল ভাবা

কিছু কিছু সম্পর্কের ব্যবধান তৈরি হতে ব্যক্তিগত আক্রমণের দরকার হয় না। কেউ কেউ অন্যের যোগ্যতাকে ঈর্ষা করেই তাকে শত্রু বানিয়ে ফেলে। কেউ এমন কিছু কাজ করল যা সমাজের অনেকের দ্বারা প্রশংসিত হচ্ছে, এতেই একধরনের মানুষের গাত্র দাহন শুরু হয়। তারা সমাজে খুব হাসিখুশি, আন্তরিক জীবনযাপন করে। কিন্তু সুযোগ এলেই নিজের যোগ্যতা টেনেই তুলনা করে বিপক্ষকে (যতই বন্ধু হোক না কেন) মিশ্রির ছুরি বসাতে মিনিটের দ্বিধা করে না। এই বিষয়টি পারিবারিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রতিযোগিতা আলিঙ্গন করে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখার চেয়ে কুৎসা রটিয়ে নিজের অবস্থান পাকা করার দিকেই এদের নজর বেশি থাকে।

মনোযোগ আকর্ষণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি

হালে মুখ বইয়ের কল্যাণে চোখে পড়ে কিছু লোক নানারকমভাবে সমাজের সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার কাজে সদা ব্যস্ত। তারা যাই করেন, যেখানেই যান, জানান দেন। তাদের ব্যাপারে আগ্রহী অন্য কিছু মানুষ তা দেখে হিংসাত্মক হয়ে বা অতি উৎসাহী হয়ে একই উপায়ে তাদের টরেটক্কা বার্তা পৌঁছে দেন যথারীতি। এবার এই প্রতিযোগিতা নদীর তীরে ভাঙা গড়ার মতো আবহমানকাল চলতেই থাকে। তাদের সঙ্গে সমাজের দায়িত্বের লেনদেন বিশেষ হয় না। সম্পর্কটা দাওয়াত, শাড়ি-কাপড়, গয়নাতেই আটকে থাকে। আর এই সদা ব্যস্ত মানুষগুলো কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে সফল। কেননা, ফেসবুক দেখে আমরা তাদের নিয়ে ঠিকই আলোচনায় বসি।

ছোটবেলায় একটি ছড়া শিখেছিলাম বাগধারা মনে রাখার জন্য।

‘পটল ডাঙার পটলা, পটল খেতে পটল তুলতে গিয়ে পট করে পটল তুলেছে, সে কথা অটল বাবুর মুখে শুনলাম।’

মানুষে মানুষে সম্পর্কের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম তাতে, বাংলাদেশে মানুষের মনুষ্যত্বতো পট করে পটল তুলেছেই আর প্রবাসে মানবিকতা, শ্রদ্ধা-সম্মান, ভালোবাসাও পটল তোলার পথে। আমরা তবে আমাদের পরের প্রজন্মকে কী দিয়ে যাব? হিংসা-বিদ্বেষ, অসম্মান, অসামাজিকতা? কেন তবে ভালোর জন্য জন্ম-জন্মান্তরের দূরত্ব শিকড় থেকে? রেলগাড়িও কিন্তু পথ চলতে হুইসিল দেয়, থামে। মানুষ হিসেবে কী এই চলা থেকে আমরা একটু থমকে দাঁড়াতে পারি না? ভাবতে পারি না প্রাপ্তিগুলো কী? আর ভুলগুলোই বা কোথায়? কোন কাজটি আসলেই পরিবার ও সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনবে? পারি, অবশ্যই পারি। করিও, আমার বিশ্বাস বেশির ভাগ মানুষ সঠিক কাজটি করি বলেই এখনো সমাজ-সংসার চলে, ফুল ফোটে, চাঁদ হাসে। আর মুষ্টি কয়েক লোক যারা সঠিক পথটির সন্ধান না পাওয়ায় হারিয়ে ঘুরছেন হেথায় সেথায়, তারাও খুব সহজেই পেয়ে যাবেন নির্দিষ্ট গন্তব্য এটাই কাম্য।

...

তুলি নুর: ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ