ভিনদেশে সেই ‘প্রথম দিন’

September 4, 2018, 6:30 AM, Hits: 63

ভিনদেশে সেই ‘প্রথম দিন’

দু’বছর আগে এক আকাশ আলো পেছনে ফেলে আমি যখন অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু করলাম তখনও জানতাম না কতোটা অন্ধকার আমার জন্য অপেক্ষা করছে! আমি শুধু জানতাম, এই অন্ধকার, পৃথিবীর সবচেয়ে নিকশ কালো অন্ধকারের চেয়েও কোনো অংশে কম হবে না। হেলসিংকির ঝলমলে বিমানবন্দরের বাইরে তখন কনকনে ঠাণ্ডা। পাঁচ ডিগ্রি। মাথার ভেতরে তখনও ঘুরছে- ভুল করলাম নাতো? পকেটে কয়েক হাজার ইউরো। অন্তত একটা ‘পরিচয়যুক্ত’ জীবন থেকে ‘পরিচয়হীন’ জীবনে পা ফেলছি! রীতিমতো দুঃসাহস দেখানো!
.
বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন অনেকেই বলেছেন সিদ্ধান্তটা নিতে অনেক দেরি করে ফেলেছি! কেউ কেউ আরেকবার ভেবে দেখার অনুরোধও করেছে। কারো কথা শুনিনি। কাড়িকাড়ি অর্থবিত্তের ক্ষুধাও আমার নেই। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জীবন ক্ষয়ের মতো ধৈর্য্য কখনও ছিল না। আমার ক্ষুধা নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেঁচে থাকা।
.
সে হিসাবে গত ৭৫০ দিনে আমি সেই ক্ষুধা কী মেটাতে পেরেছি?
ঢাকায় চাকরি জীবনের শুরুতে যে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, যে জীবন কাটিয়েছি তার সঙ্গে তুলনা করলে বলবো এবারের নতুন শুরুটা ছিল অনেক গোছানো। যদিও পরতে পরতে ছিল অনিশ্চয়তা। আমি আসলে পিঁপড়া প্রজাতীর মানুষ! যতক্ষণ সঞ্চয় আছে ততক্ষণ চিন্তাহীন, পুঁজিতে টান পড়লে আবার লড়াইয়ে নেমে পড়ায় আনন্দ খুঁজে বেড়াই। এভাবে জীবন মন্দ নয়। কী লাভ, যে ভবিষ্যতের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তা নিয়ে চিন্তা করে বর্তমানকে অসুখী করে তোলার মধ্যে? যদি দূরতম ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই জীবনটাই বিলিয়ে দিলাম তাতে উপভোগটা করবো কবে?
.
এখানে আসার আগে আমার এক প্রবাসী বন্ধু বলেছিল- দোস্ত বিদেশে এলে সবার আগে নিজেকে ভাঙতে হয়, তারপর তুই নিজের মতো তোকে গড়বি। ওর কথাটা কিন্তু বেশ শুনেছিলাম। হেলসিংকি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই ভাঙনের শুরু। পাঁচ নাকি ছয় ইউরো দিয়ে বার্গার খেয়ে খরচের চিন্তা করে কোনো ধরনের পানীয় না নেওয়া; দুই ইউরো দিয়ে লাইটার কিনে মনে মনে দুইশ টাকার হিসেব কষে দেশি বেনসন অ্যান্ড হ্যাজেসের প্রতিটি টানকেই কষ্টের টান মনে হয়েছিল। আসলে সেদিন থেকেই অভ্যস্ত হওয়ার লড়াইয়ে নেমে গেছি। ১২ ঘণ্টার ট্রেন জার্নিতে ইউরো আর টাকার তুলনা করতে করতে এক ফোটা দানাপানি পেটে না দিয়ে যখন শেষ স্টেশনের অপেক্ষা করেছি সেদিনই আসলে বিদেশের লাইফে অনেক অভিজ্ঞ হয়ে গেছি আমি।
.
তারপর বছর ঘুরলো। এরপর ঘুরলো আরও একটি বছর। একদিকে পড়াশোনার চাপ অন্যদিকে আর্থিক যোগান নিশ্চিতের লড়াই- দুইয়ের মাঝে পড়ে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আবিষ্কারে বিভোর হয়ে থাকি। হয়তো একদিন ঠিকই আবিষ্কার করবো আমি আমার আমিকে! সেই অপেক্ষায়!
.
থাক, আজ এ পর্যন্তই। আর বরাবরের মতো প্রতিটা লেখার শেষে যা লিখি- প্রতিটা প্রাণ সুস্থ থাকুক, প্রতিটা মন প্রশান্তিতে ঘুরে বেড়াক, দেশপ্রেম জেগে উঠুক প্রাণে প্রাণে, হৃদমাঝে।

লেখক : ফিনল্যান্ড প্রবাসী সাংবাদিক, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইউনিভার্সিটি অব অউলু 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ