আমেরিকার সেই বন্ধকি দুঃস্বপ্ন

September 4, 2018, 3:55 PM, Hits: 786

আমেরিকার সেই বন্ধকি দুঃস্বপ্ন

হ-বাংলা নিউজ : জেসাস রদ্রিগেজের এখনো মনে পড়ে এক যুগ আগের ওই দিনের কথা, যেদিন ঘরের প্রিয় সব আসবাবপত্র বিক্রি করে দিতে হয়েছিল তাঁকে। সন্তানেরা খুব অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘কেন এগুলো বিক্রি করা হচ্ছে?’ বুকে পাথর চেপে হাসিমুখে ওদের বলেছিলেন, ‘আমরা “ডিজনি ওয়ার্ল্ড” দেখতে যাব।’ সন্তানেরা জানতে চেয়েছিল, ‘“ডিজনি ওয়ার্ল্ড” যেতে কি এত টাকা লাগে বাবা, যে আমাদের ফ্রিজ আর খাট বিক্রি করে দিতে হচ্ছে?’

ওই দিন সন্তানদের আশ্বস্ত করলেও মনের গভীরে কষ্টের সেসব দিনের কথা রদ্রিগেজের মনে এখনো যেন জীবন্ত। ভীষণ অর্থের প্রয়োজন ছিল তাঁর, নিজেদের বাড়িটা হারিয়েছিলেন। অথচ ওই বাড়ির ঋণেই তাঁর দিশেহারা অবস্থা, ‘ডিজনি ওয়ার্ল্ড’ ঘুরতে যাওয়া দূরে থাক। সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি মনে করলে এখনো গলাটা ধরে আসে তাঁর। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা হাজার হাজার মানুষের মতো তাঁর জীবনও পাল্টে দিয়েছিল। বর্তমানে ৫৭ বছরের রদ্রিগেজ ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি শহরে এটি ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে বাস করছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে, প্রায় এক যুগ আগে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সেই দুঃস্বপ্নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গৃহায়ণ খাতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। দেশটির বন্ধকি বাজারের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতের শিথিল নিয়ন্ত্রণই মন্দার শুরুটা করেছিল। সে সময় ব্যাংকগুলো খুব সহজেই ঋণ দিচ্ছিল।

২০০৫ সালে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান রদ্রিগেজ। অল্প দিনেই ঋণ নিয়ে বাড়ি কেনেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে নিজের বাড়ি থাকায় নিজেকে অসম্ভব সৌভাগ্যবান বলে মনে করতে শুরু করেন তিনি। ওই সময় একটি ছাপার দোকানে চাকরি করে বছরে ১৫ হাজার ডলার পেতেন রদ্রিগেজ।

এত অল্প বেতনের চাকরি অথচ বাড়ির মালিক হয়েছেন, এ যেন এক স্বপ্ন পূরণই ছিল তাঁর কাছে। ওই সময়টায় রদ্রিগেজের মতো অনেক স্বল্প আয়ের মানুষ ঋণ নিয়ে বাড়ি কিনেছিলেন। রদ্রিগেজের প্রতিবেশী যিনি ঘরে ঘরে পিৎজা পৌঁছানোর চাকরি করতেন, তিনিও ঋণ নিয়ে কিনে ফেললেন বাড়ি। তবে এসব মানুষের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

২০০৭ সাল থেকে মন্দা শুরু। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি বিক্রি শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা। অথচ বাজারে দাম নেই। ২০০৮ সালে তা সারা বিশ্বেই সংক্রমিত হয়। অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলো কেন, তা নিয়ে ফরক্লোজার আইনজীবী শ্যারি ওলেফসন বলেন, একটি কারণ হলো—ব্যাংকগুলো খুব দ্রুত মুনাফা লাভের আশায় গ্রাহকদের সহজ শর্তে বাড়ির ঋণ দিচ্ছিল। বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় কারণ—অনেক মার্কিন নাগরিক যাঁরা আবাসন খাতে অভিজ্ঞ ছিলেন না, বেকার ছিলেন, তাঁরাও এ খাতে বিনিয়োগ করা শুরু করেন।Eprothomalo

ওলেফসন বলেন, অনেক মানুষ ওই ফাটকা বাজারে বাড়ি কিনেছিলেন। তাঁদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনও দেখা গেছে যে সেলুনের কর্মী চার-পাঁচটা বাড়ি কিনেছেন। কিন্তু যখন এই আবাসন খাতের বুদ্‌বুদ ছাপিয়ে পড়ল, তখন বাড়ির দামও কমে গেল। আর বন্ধকি ঋণের সুদের হারও রাতারাতি বেড়ে গেল। একেকজনের ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা বেড়ে গেল বহু গুণ। অনেকেই ঋণ পরিশোধের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

রদ্রিগেজের ক্ষেত্রে যা হলো, তাঁর ঋণের সুদহার ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হলো। ২০০৮ সালে এসে তাঁর ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সম্পত্তির দাম কমে হলো মাত্র ৪৯ হাজার ডলার।Eprothomalo

ব্যাংকগুলো যখন ঋণের সামঞ্জস্য করা শুরু হলো, তখন অনেকেই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। পুরো বিষয়টি অর্থনীতিতে একধরনের তরঙ্গ প্রভাব ফেলে। অনেকটা পুকুরে পাথর ফেলে তরঙ্গ সৃষ্টি করার মতো। একদিকে বন্ধকি জমির দখল নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন করে বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করেছে মানুষ। এ কারণে বাড়ির দাম পড়তে শুরু করে। আবাসন খাতের সংকট ছড়িয়ে গেল আর্থিক খাতে। আর্থিক খাত ও অর্থনীতিতে মন্দা এভাবে শুরু হওয়ার পর তা ছড়িয়ে পড়ে ওই সব শিল্পে, যেগুলো আর্থিক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশনের পর ওটায় ছিল সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা।

আবাসন খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা রিয়েলটিট্রাক জানায়, ২০০৮ সালে রেকর্ড পরিমাণ বন্ধকি সম্পত্তির দখল নেওয়া হয়। একদম সঠিক হিসাব হলো ৩১ লাখ, যা ২০০৭ সালের চেয়ে ৮১ শতাংশ ও ২০০৬ সালের চেয়ে ২২৫ শতাংশ বেশি। এরপর ২০০৯ সালে ৩৮ লাখ বন্ধকি সম্পত্তির দখল নেওয়া হয়, যা ২০০৮ সালের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নেভাদা, ফ্লোরিডা ও অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন খাতের এমন পতন এখনকার পরিস্থিতে হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এখন বন্ধকি ঋণ পাওয়া বেশ কঠিন।

ফিরে আসি তাহলে রদ্রিগেজের কাছে। এখন একটি বিমা কোম্পানির আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন রদ্রিগেজ। নিজের জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষা তিনি অন্য মানুষকে দেন। সবাইকে তাঁর মতো ঋণের ভারে না জড়ানোর পরামর্শ দেন রদ্রিগেজ।

 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ