প্রিয় দেশ প্রিয় মানুষ

September 6, 2018, 6:45 AM, Hits: 336

 প্রিয় দেশ প্রিয় মানুষ

হ-বাংলা নিউজ : স্পেনের ছোট একটা শহর ভ্যালেন্সিয়া ডেল আল্কান্তারা গিয়েছিলাম সেবার। সঙ্গে ইউরোপীয় কিছু বন্ধু। সকালবেলা। কফি খেয়ে শহর দেখতে বেরোই। সারা শহরজুড়ে মানুষ। উৎসব করছে। সিটি সেন্টারে চলছে কনসার্টের আয়োজন। শহরের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এটা অনেক পুরোনো একটা উৎসব। ফুল দিয়ে সবাই অনেক মজা করে প্রতি বছর এ উৎসব উদ্‌যাপন করে। শহরটা বেশ পুরোনো। সুন্দর। ছিমছাম। ছোট ছোট গলি। নতুন-পুরোনো ঘরদোর। অনেকটা মুরিশ স্টাইলে করা। রাস্তায় মানুষের ঢল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বৃষ্টি পেয়ে বসল। আমরা দৌড়ে গিয়ে অনেক প্রাচীন একটা ক্যাসেলে আশ্রয় নিই।

‘এখানে এই সময়ে এভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা না। তারপরেও হচ্ছে। বাজে একটা অবস্থা।’—নাখোশ হয়ে বললেন স্প্যানিশ বন্ধু গিলেরমু। তাঁর কথা শেষ না হতেই পেত্রিসিয়া বলে উঠলেন, ‘ব্রাসেলসের ওয়েদার বোধ হয় পাওনি এখনো। খুব বিরক্তিকর।’ ব্রাসেলসে আমি ছিলাম অনেক দিন। ওখানের বিখ্যাত সিন্ট লুকাস ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে টের পেয়েছিলাম শীতকালে ব্রাসেলসের শৈত্যপ্রবাহ আর প্যানপ্যান বৃষ্টি কতটা পীড়া দেয়। আন্তর্জাতিক একটা শহর হলেও ব্রাসেলসের আবহাওয়া দেখেছি কারও পছন্দ না। সবাই অভিযোগ করত। অনেক দিন পর পেত্রিসিয়া হঠাৎ মনে করে দিলেন ব্রাসেলসের কথা। আমি তাঁকে সায় দিলাম। আমাদের আরেক বন্ধু বেঞ্জামিনের বাড়ি ফ্রান্স। তাঁর পোষা কুকুর সেবাস্তিয়ানকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। তাঁর গল্প কুকুর নিয়ে। ফ্রান্সের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত। মারিয়া বলছিলেন, তাঁর দেশ এস্তোনিয়ার মানুষেরা নাকি খুব হতাশ। এর অন্যতম কারণ ওখানে সূর্যের আলো কম পড়ে। এভাবে কত হরেক রকমের অভিযোগ এদের!

বার্লিন, প্যারিস ও রোমে ভিড় বেশি। স্টকহোম আর হেলসিঙ্কি অনেক ঠান্ডা ও ব্যয়বহুল। বার্সেলোনায় পকেটমারে ভরা। জেনেভায় মানুষ একটু নাক উঁচু স্বভাবের। খেয়াল করে দেখলাম, চাকরির সংকট থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনীতিসহ বহু সংকটের চেয়েও ইউরোপের মানুষের দুঃখ বেশির ভাগ সময় আবহাওয়া ও মানুষের ভিড় নিয়ে।

ভ্যালেন্সিয়া ডেল আল্কান্তারা শহরে প্রাচীন ক্যাসেল

ভ্যালেন্সিয়া ডেল আল্কান্তারা শহরে প্রাচীন ক্যাসেল

গত সাত বছরে ইউরোপের প্রায় ২৫টি দেশ ঘুরেছি। কখনো ফিল্ম ও পড়াশোনার কাজে, কখনো শুধু ঘুরে বেড়ানোর জন্য ওসব দেশে যাওয়া। একেকটা দেশে দুঃখের রং একেকরকম। মাঝে মধ্যে খুব অবাক লাগে, এদের হতাশা দেখলে। আত্মহত্যার হার বেড়েই চলছে। দিন দিন মানুষ একলা হয়ে পড়ছে। ইউরোপের বহু গ্রামে দেখেছি, কোনো তরুণ ছেলেমেয়ে বলতে গেলে নেই। ক্যাফে বারের সামনে বুড়োবুড়িরা বসে রোদ পোহায়। কফি খায়। মদ খায়। আড্ডা দেয়। মেলা সময় তাদের। ক্রিসমাসে ছেলেমেয়ে নাতিপুতিদের দেখা মেলে। তাও কিছু সময়ের জন্য। খুব গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এরা ব্যক্তি পর্যায়ে কতটা ভাঙা। কতটা নিঃসঙ্গ! কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভালো থাকায় এদের ভেঙে পড়াটা ওভাবে চোখে পড়ে না।

মাঝে মধ্যে হঠাৎ করে দেশের মানুষগুলোর চোখ-মুখ ভেসে ওঠে। কী সহজ সরল মানুষ। একটা সাদামাটা জীবন পার করতে সেকি প্রাণপণ লড়াই। একটু বৃষ্টি হলেই শহরের রাস্তাগুলো নদী হয়ে যায়। বাস–ট্রেনগুলোতে দম বন্ধকর অবস্থা। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে প্রতিদিন। মেডিকেলে ভালো চিকিৎসা নেই। বাজারে দাম চড়া। রাস্তায় দীর্ঘ ট্রাফিক। খেলার মাঠ নেই। পর্যাপ্ত সিনেমা-থিয়েটার নেই। পরিবার ও আপনজনের সঙ্গে আনন্দে একটু নিরাপদ সময় কাটানোর জায়গা নেই। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থা খারাপ। বিচার ব্যবস্থায় আস্থা নেই। দক্ষ প্রশাসন নেই। চাকরি নেই। এই আরও অনেক নাই–এর মাঝে হরহামেশা লেগে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক দুর্যোগ, খাবারে ভেজাল, কয়লা চুরি, ব্যাংক ডাকাতি। এত এত কিছুর পরেও কী আজীব, মানুষগুলোর বলতে গেলে তেমন কোনো অভিযোগই নেই। একটু নিরাপদে দুমুঠো খেয়ে কাজকর্ম করে জীবন পার করে দিলেই যেন শান্তি আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষের!

ভ্যালেন্সিয়া ডেল আল্কান্তারা শহরে লেখক

ভ্যালেন্সিয়া ডেল আল্কান্তারা শহরে লেখক

সকালবেলা গার্মেন্টস থেকে শুরু করে সদরঘাটের শ্রমিক, কৃষক, জেলে, হকার, করপোরেট, সরকারি–বেসরকারি সব চাকুরে ছুটছে কাজে। কী গাদাগাদি মানুষ, কী দুর্বিষহ দূষিত বাতাস! তবু জীবন টেনে নিয়ে যায়। মুখ বুজে, মাথা নুয়ে সব মেনে নেয়। অনেক ঠেলাঠেলির পর যে মেয়েটা বাসে উঠে সিট পেল, তার চোখে নিমেষে নেমে এল ঘুম। ঘামগুলো ঠান্ডা হয়ে শরীরে নিয়ে এল শীতল আমেজ। টিউশনির টাকা পেয়ে সেকি আনন্দ তরুণ ছাত্রটির। দিন শেষে বাজার সদাই হাতে দিনমজুরের হাসিটা—আহ কী পবিত্র সুন্দর!

প্রিয় দেশ, প্রিয় মানুষ! এ পৃথিবীতে তোমরাই সত্যিকারের নায়ক। তোমাদের দেখে পৃথিবী শিখুক, কীভাবে বাঁচতে হয়। কীভাবে লড়াই করতে হয়। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ