প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে শারদীয় দুর্গোৎসব

September 25, 2018, 1:58 PM, Hits: 1116

প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে শারদীয় দুর্গোৎসব

সুব্রত  চৌধুরী, আটলান্টিক সিটি থেকে : বাংলার আকাশে এখন ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা পেঁজা সাদা তুলোট মেঘের ছোটাছুটি, কাশবনে কাশ ফুলের দোল, শিউলি ফুলের সুগন্ধে মাতোয়ারা ধরিএী।যদিও সুদূর মার্কিন মুলুকে এসবের  কোন ছোঁয়াই  নেই, তথাপি অন্তরে লালন-পালন করা দেশীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য মনন পোড়া মনকে জানান দেয়-ঋতুটা শরৎ,সময়টা শারদোৎসবের।আর এই বার্তা পেয়েই প্রবাসী বাঙালি হিন্দুরা মেতে উঠেছে  শারদোৎসবের হরেক আয়োজনে। সবাই এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। সারা বিশ্বের সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের  মতো  নিউজারসি অঙ্গরাজ্যের আটলান্টিক সিটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী সনাতনী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও দুর্গোৎসবের কাউন্টডাউনে ব্যস্ত। 

সুদূর এই প্রবাসে  বহুজাতিক  ধর্মীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে  বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে এই দুর্গোৎসবের কতটুকু আবেদন রয়েছে সেই সম্পর্কে জানার জন্য মুখোমুখি হয়েছিলাম এই প্রজন্মের কয়েকজনের সাথে।তাদের জবানীতে শোনা যাক দুর্গোৎসব সম্পর্কে তাদের মনোভাব।

সেওতি  চৌধুরী-২০০২ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সেওতি  চৌধুরীর কানাডায় আগমন আট  বছর বয়সে।এডমনটনের হ্যারি এইনলে হাই স্কুলের একাদশ গ্রেডের এই কৃতী ছাএী জানা‌লো, পূজার দিনগুলো সে স্থানীয় আলবার্টা বংগ সোসাইটির দুর্গোৎসবেই কাটায়।সন্ধ্যা গড়াতেই মা-বাবার সাথে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে উৎসব প্রাঙ্গনে ছুটে যায়,দেবীর প্রার্থনা করে।তাদের জন্য নির্ধারিত দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত  পরিবেশন করে,অন্যদিন অন্যান্যদের পরিবেশনা সে প্রাণভরে উপভোগ করে।আর প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে ঢোল-করতালের তালে তালে সমবয়সীদের সাথে  আরতি নৃত্যে মেতে ওঠা-তার কাছে সে এক অনাবিল আনন্দ।তবে বিজয়া দশমীর  দিন    সকালে তার মন বিষাদে ভরে যায়।দুর্গোৎসবে স্কুল খোলা থাকায় আনন্দ-উৎসবের রাশ টেনে ধরে রাখতে হয় বলে তার একটু মন খারাপ হয়।

বাংলাদেশের পূজার অনেক কিছুই সে এখানে উপভোগ করতে পারে না।বিশেষ করে পূজার অনেক আগে থেকেই মা-বাবার সাথে বিভিন্ন বিপনীতে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে  ঠাকুর দেখা, দশমীর দিন  প্রতিমা নিরঞ্জন-এসব কিছুই তাকে বেশ পীড়া দেয়।তারপরও সে মনে করে,বিদেশ-বিভুঁইয়ে এখানে পূজার যে ক'টা দিন আনন্দ-উৎসবে কাটে-তাও কম কীসের?

শারদীয়া রায়- ২০০০ সালে  যুক্তরাষ্ট্রে  জন্মগ্রহন করা শারদীয়া রায়   এদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠলেও   শিল্পবোদ্ধা  মা-বাবার সার্বিক দেখভালে এই দেশের বহুজাতিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতি তার মনোজগতে তেমন আঁচড় কাটতে পারেনি। রাটগারস বিশ্ববিদ্যালয় এর  কৃতী এই শিক্ষার্থী জানালো,সেনট্রাল জারসিতে তার বসবাস হলেও আটলান্টিক সিটির গীতা সংঘ আয়োজিত দুর্গোৎসবে সে যোগ দেয়,কারন সেখানেই তার বেড়ে ওঠা।পূজার ক'টা দিন সে বেশ আনন্দ-উৎসবেই কাটায়।পূজায় সে শাড়ি ও লেহেংগা পরতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য   বোধ করে।পূজার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়    শিল্পীদের  পরিবেশনা উপভোগ করে।পূজোর ক’টা দিন সে পূজার প্রসাদ গলাধ:করন করে বেশ তৃপ্তি পায়।পূজোর সময় বিশ্ববিদ্যালয়  খোলা থাকায়  লাগামহীনভাবে আনন্দ করতে পারে না  বলে তার মন একটু খারাপই থাকে।তারপরও দুর্গোৎসব বলে কথা।দশমীর দিন সিঁদুর খেলার ক্ষণটা সে বেশ উপভোগ করে।এছাড়া সংগীত রজনীতে  বান্ধবীদের সাথে সে নেচে- গেয়ে বেশ আনন্দ পায়।দেশের পূজার কোনও সুখস্মৃতি তার  না থাকলেও নাড়ির বন্ধন অটুট রাখতে প্রবাসে শত প্রতিকূলতার মাঝেও দুর্গোৎসবের আনন্দটুকু কোনওভাবেই হারাতে সে রাজী নয়।তাই সে প্রাণভরে পূজার প্রতিটি আনন্দক্ষণ উপভোগ করে।

আর্য্যনীল দও -আর্য্যর জন্ম ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ।এরপর ভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও সংস্কৃতিসেবী অভিবাবকদের সার্বিক দেখভালে আর্য্য ধর্মীয় অনুশাসনগুলো বেশ ভালোই মেনে চলে।বর্তমানে ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলের নিস স্কুলের নবম গ্রেডের কৃতী ছাএ আর্য্য জানালো, বিভিন্ন ধর্মীয় আচারাদি পালনের মাধ্যমে সে  দুর্গোৎসব উদযাপন করে।দুর্গাপুজা উপলক্ষে সে নতুন পাজামা-পানজাবী কেনে,পূজা মন্ডপের বিভিন্ন ধরনের উপাদেয় প্রসাদ খেয়ে সে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।বেংগলি এসোসিয়েশন অব নর্থ ফ্লোরিডা আয়োজিত দু’দিন ব্যাপী পুজার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে তবলা বাজায়,এবছর   উপস্থাপনার গুরু দায়িত্ব  সামলাবে।সে আরো জানাল, দুর্গাপূজার সময়  বাংলাদেশে থাকা  আত্মীয়স্বজনদের তার খুব মনে  পড়ে, যা তাকে খুব পীড়া দেয়।এছাড়া দেশের দুর্গাপূজার উৎসব-আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সে খুব মনোকষ্টে ভোগে।

সৃজন রায়  -২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহনকারী সৃজন রায় এখানকার বহুজাতিক  কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও সংস্কৃতিপ্রেমী মা-বাবার সার্বিক পরিচর্যায় আপন কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে রেখেছে  আষ্ঠে-পৃষ্ঠে।তাইতো সে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি করে। আটলান্টিক সিটি হাই স্কুলের  নবম গ্রেডের কৃতি ছাএ সৃজন রায় জানালো,পূজার ক'টা দিন সে মাতৃদেবীর আরাধনা করে,সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করে, নৃত্যারতি করে।পূজার ক'টা দিন সে বাংগালির ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবী-পাজামা পরিধান করে,পূজোয় পরিবেশিত বিভিন্ন পদের মুখরোচক প্রসাদ গলাধঃকরন করে।তার মনে খুব খেদ, দুর্গাপূজার সময় স্কুল বন্ধ না  থাকায় মনমতো পূজার আনন্দটুকু উপভোগ করতে পারে না বলে। দুর্গা পূজা শেষে  'সংগীত রজনী'তে শিল্পীদের পরিবেশনার সময়  সমবয়সীদের সাথে মিলেমিশে  নেচে-গেয়ে একাত্ম হওয়া সে খুবই উপভোগ করে।সৃজন রায়  আরো জানাল,বাংলাদেশে দুর্গাপূজার আয়োজনের যে ব্যাপকতা তা হয়তো এখানে নেই,তারপরও দূর প্রবাসে দুর্গাপূজার আনন্দ-আয়োজনে মেতে থাকার যে সুযোগ মেলে তাও কম কী?

চন্দ্রিমা চক্রবর্তী  -নিউজারসি অংগরাজ্যের  নর্থফিল্ডে বসবাসরত চন্দ্রিমা চক্রবর্তীর    জন্ম  ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ।বহুজাতিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে  সে   বেড়ে উঠলেও তার মনোজগতে তা তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।তার মা-বাবা দু'জনই শিল্পমনা  হওয়ায় একটা বাংগালি   সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই তার বেড়ে ওঠা।নর্থফিল্ডের  মেইনল্যান্ড রিজিওনাল হাই  স্কুলের নবম গ্রেডের কৃতি এই ছাএী জানাল, পূজার চারদিন সে খুব আনন্দ- উচ্ছ্বাসে কাটায়।পূজার   সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে  তার সমবয়সীদের   পরিবেশনা প্রাণভরে উপভোগ করে।সে নিজেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।দুর্গাপূজায় ঢাকের বাদ্যির তালে তালে হাল ফ্যাশনের লেহেংগা পরে বান্ধবীদের সাথে নাচার মুহূর্তটা তার কাছে খুবই প্রিয়।বিজয়া দশমীর দিন লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে অঞ্জলি শেষে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠা সে খুব উপভোগ করে।তাছাড়া দুর্গা পূজা শেষে  'সংগীত রজনী'তে শিল্পীদের পরিবেশনার সময়  বান্ধবীদের সাথে মিলেমিশে  নেচে-গেয়ে একাত্ম হওয়া সে খুবই উপভোগ করে। দুর্গাপূজার সময় স্কুল বন্ধ না  থাকায় মনমতো পূজার আনন্দটুকু উপভোগ করতে পারে না বলে এক ধরনের দুঃখবোধ তাকে তাড়া করে ফেরে।

আমাদের এই প্রবাস  প্রজন্ম দিবানিশি ভিন্ন সংস্কৃতির ডামাডোলের মধ্যেও যে এখনো নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আচারাদি পালন করছে,বাংগালি  কৃষ্টি ও  সংস্কৃতি অন্তরে লালন করছে, বিজাতীয় সংস্কৃতির চোরাবালিতে পা ফেলছে না- তা সত্যিই আশা জাগানিয়া,যা আলোক বর্তিকা হিসাবে কাজ করবে প্রবাসে  বেড়ে ওঠা  পরবর্তী  প্রজন্মের জন্য। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ