‘যে গিটারে দেশ অপমানিত হয়, তা দ্বিতীয়বার বাজাই না’

October 19, 2018, 10:49 AM, Hits: 219

 ‘যে গিটারে দেশ অপমানিত হয়, তা দ্বিতীয়বার বাজাই না’

হ বাংলা নিউজ : ‘যে গিটারের জন্য দেশ অপমানিত হয়, সেই গিটার আইয়ুব বাচ্চু দ্বিতীয়বার বাজায় না।’ নিউইয়র্কের গিটার সেন্টারের ম্যানেজারকে বলেছিলেন বাংলাদেশের গিটারের জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। ২০ বছর আগে যখন এলআরবি প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরে যায়, তখন ঘটনাটি ঘটেছিল। আর এবার তা জানালেন এলআরবির ব্যবস্থাপক শামীম। গিটার নিয়ে এমন অস্বস্তিকর ঘটনার কথা আইয়ুব বাচ্চু এর আগেও বলেছিলেন।

আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে যাঁরা একটু–আধটুও জানেন, তাঁদের কারোরই অজানা নয়, গিটার নিয়ে তাঁর পাগলামির কথা। এই গিটার বাজানোর জন্য সংগীতজীবনের শুরুর দিকে কত কষ্টই–না করতে হয়েছে তাঁকে। শুধু তা-ই নয়, নিত্যনতুন ব্র্যান্ডের গিটার সংগ্রহ করা ছিল নেশার মতো।

১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো এলআরবি শো করতে যায়। শো শেষে ব্যান্ডের অন্য সদস্যদের নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু যান নিউইয়র্কের গিটার সেন্টারে। আইয়ুব বাচ্চু সেখানে সামনে থাকা গিটারগুলো নেড়েচেড়ে দেখছেন। হঠাৎ আইভানেজ গিটারের ওপর চোখ পড়ে তাঁর। কাচের বাক্সে বন্দী। দোকানের ব্যবস্থাপককে এই গিটারের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি আইয়ুব বাচ্চুর দিকে ভালো করে তাকান। জানতে চান, কোন দেশ থেকে এসেছ? এরপর বললেন, এই গিটার তোমার মতো বাংলাদেশির জন্য নয়। এটা এখানে সবচেয়ে দামি গিটার, তুমি বরং অন্যটা দেখ। লোকটির কথায় আইয়ুব বাচ্চু কষ্ট পান। বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন দেশটাকে অপমান করা হয়েছে, তাই ভেবে।

আইয়ুব বাচ্চুর মনে জেদ চাপে। তিনি সেই ব্যবস্থাপককে অনুরোধ করেন, ‘গিটারটি একবার দেখার সুযোগ দাও। আমার আর টিমের সবার কাছে যত ডলার আছে, আশা করি এটা নিতে পারব।’ লোকটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও গিটারটা দেখতে দেন আইয়ুব বাচ্চুকে।

গিটার হাতে পেয়ে আইয়ুব বাচ্চু বাজানো শুরু করেন। এমনভাবে বাজালেন, আশপাশে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। আইয়ুব বাচ্চুর বাজানো দেখে সবাই অবাক। এরপর গিটার ফেরত দিতে গেলে লোকটি আইয়ুব বাচ্চুকে বললেন, ‘তুমি অসাধারণ বাজাও, এই গিটার তোমার জন্যই। এটা আমি তোমাকে অর্ধেক দামে দেব।’ আইয়ুব বাচ্চু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘এটা তুমি আমাকে বিনে পয়সায় দিলেও আমি নেব না, তুমি আমার দেশকে অপমান করেছ। যে গিটারের জন্য দেশ অপমানিত হয়, সেই গিটার আইয়ুব বাচ্চু দ্বিতীয়বার বাজায় না।’

এলআরবি প্রথম দেশের বাইরের সফর ছিল ভারতের কলকাতা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে যায় ১৯৯৮ সালে। এই দলে আইয়ুব বাচ্চু ছাড়াও ছিলেন রিয়াদ, স্বপন ও এস আই টুটুল।

গিটার নিয়ে পাগলামির অনেক কথাই শুরুর দিকে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলেছেন কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। তিনি নিজেকে বলতেন, ‘ভাড়াখাটা গিটারের ভাড়াখাটা প্রেমিক’। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘গান নয়, গিটার আমাকে ঘরছাড়া করেছিল। গিটারের জন্যই সংগীতযুদ্ধে নেমেছিলাম। সত্তরের দশকে আমি ভাড়ায় গিটার বাজাতে যেতাম। গিটারটাও ভাড়া নিয়ে যেতাম। ওই সময় ডিসকো কোম্পানির একটি গিটার আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে ৩০ টাকা দিনপ্রতি ভাড়ায় গিয়ে শো করতাম। ভাড়া হিসেবে ৩০ টাকা দেওয়ার পর আরও ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে যেত। এটা দিয়েই দিন চালাতাম। এখন কিন্তু আমার নিজের দেশি-বিদেশি ৪০টা গিটার আছে। কিন্তু সেই ভাড়াখাটা গিটারের দিনগুলোর কথা আজও জীবন্ত হয়ে আছে আমার মনে।’

তবে জীবনের শেষ দিকেও তিনি তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইসহাকের প্রথম কিনে দেওয়া গিটারের কথা মনে রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর নামীদামি ব্র্যান্ডের ৪০টা গিটার আমার সংগ্রহে আছে। তারপরও আফসোস করি, বাবার কিনে দেওয়া প্রথম গিটারটার জন্য। সেটা ১৯৭৪ সালের দিকে। তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। সেটা ছিল একটি অ্যাকুস্টিক গিটার। কে কবে সেই গিটার নিয়ে গেছে, তার কোনো হদিস পাইনি।’ 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ