এই তিন প্রিন্সের নিয়তি কি খাসোগির মতো ?

October 25, 2018, 3:37 PM, Hits: 210

 এই তিন প্রিন্সের নিয়তি কি খাসোগির মতো ?

হ বাংলা নিউজ : তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার পরই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও সৌদি আরবের অন্ধকারের পেছনে থাকা নানান খবর বের হয়ে আসছে। খাসোগি কাণ্ডের পর রাজপরিবারের পাঁচজন প্রিন্স নিখোঁজ হওয়ার খবর বেরিয়েছিল। রাজপরিবারের ওই সদস্যদের ‘গুম’ করা হয়েছে বলে জার্মানিতে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থাকা যুবরাজ খালিদ বিন ফারহান আল-সৌদ অভিযোগ করেছিলেন। এবার জানা গেল ইউরোপে ছিলেন এমন তিন সৌদি রাজপুত্রকে অপহরণের পর আর পাওয়া যায়নি। এই তিন রাজপুত্রকে নিয়ে বিবিসি একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে।

অনেক দিন ধরে ইউরোপে বসবাস করছিলেন সৌদি আরবের তিন রাজপুত্র। এরা সবাই ছিলেন সৌদি শাসকের কঠোর সমালোচক। তাদের ২০১৫-২০১৭ সালের মধ্যে অপহরণ করা হয়। প্রত্যেককে অপহরণের পর সৌদি আরবে আনা হয়েছিল বলে প্রমাণও আছে। কিন্তু অপহরণের পর থেকে ওই তিন যুবরাজের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা কোথায় কেউ জানে না। তাদের ভাগ্য কি খাসোগির মতো হয়েছে কি না তাও জানা যায়নি। কারণ এসব প্রশ্নের উত্তরে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো জবাব মেলে না। তিন যুবরাজ হলেন সুলতান বিন তুর্কি বিন আবদুল আজিজ, রাজপুত্র তুর্কি বিন বান্দার ও রাজপুত্র সউদ বিন সাইফ আল-নাসের।

তুর্কি বিন আবদুল আজিজ

সুলতান বিন তুর্কি বিন আবদুল আজিজ সৌদির সাবেক বাদশাহ ফাহাদের ভাতিজা। রাজপুত্রদের মধ্য অন্যতম প্রিয়ও ছিলেন তিনি। সুইজারল্যান্ডের একটি হোটেলের ওপরে আলাদা করে বানানো একটি বাসায় থাকতেন। তার নিরাপত্তার জন্য লোকও ছিল। সকালের নাশতার দাওয়াতে যাওয়ার সময় ২০০৩ সালের ১২ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে অপহরণ করা হয় তাঁকে। এর আগে সৌদি শাসনের কঠোর সমালোচক সুলতান বিন তুর্কি বিন আবদুল আজিজকে সৌদিতে ফিরে আসতে বারবার রাজ পরিবার থেকে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি শোনেন নি, সুইজারল্যান্ডেই ছিলেন তিনি। অপহরণের পর ছাড়া পান তিনি। শেষবার ২০১৬ সালে প্যারিস থেকে অপহরণ করা হয়। এই অপহরণের পর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি সুলতান আবদুল আজিজের।

প্রথম অপহরণের পর সুলতান আজিজকে হোটেলের একটি কক্ষে নেওয়া হয়। মুখোশ পরা কয়েকজন সুলতানের সামনে আসেন। বেদম পেটানোর পর সুলতান আজিজকে হাত কড়া পরানো হয়। গলায় ধরে রাখা হয় ইনজেকশনের সুচ। অচেতন সুলতান আজিজকে জেনেভা বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেই সময়ের দেশটির ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রী শেখ সালেহ আল-শেখ ওই হোটেলের পাশের কক্ষেই ছিলেন। ছাড়া পাওয়ার পর সুইজারল্যান্ডের আদালতে এসব কথা বলেন সুলতান আজিজ।

সুলতান আজিজের যোগাযোগ কর্মকর্তা এডি ফেরাইরা বলেন, আমরা সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। কোথাও থেকে কোনো সাড়া পাইনি। ওই দিন (অপহরণের দিন) বিকেলে সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দুজন লোক আসলেন। তিনি বলেন, সুইজারল্যান্ডে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত হোটেলে এসেই ম্যানেজারকে বলে হোটেলের সবাইকে বের করে দিলেন। বললেন, সুলতান আজিজের নিরাপত্তায় যারা ছিলেন তারা চলে যেতে পারেন তাদের আর প্রয়োজন নেই। সুলতান সৌদি আরবে আছে।

২০০২ সালে সুলতান আজিজ চিকিৎসার জন্য ইউরোপে চলে আসেন। এরপরই থেকে সৌদি রাজপরিবারের শাসন নিয়ে নানান সমালোচনা করছিলেন তিনি। যুবরাজ এবং কর্মকর্তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্য দিতেন সুলতান আজিজ। কিন্তু সুলতান আজিজকে কেনই বা অপহরণ করা হয়েছিল তা ওই সময় জানা যায়নি।

প্রিন্স তুর্কি বিন বান্দার পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে। ছবিটি ২০০৩ সালের। ছবি: বিবিসি

তুর্কি বিন বান্দার

রাজপুত্র তুর্কি বিন বান্দার ছিলেন সৌদি সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন। কিন্তু উত্তরাধিকার রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে তুর্কি বিন বান্দারকে দীর্ঘ সময় সৌদির কারাগারে বন্দী থাকতে হয়। ছাড়া পেয়ে ২০১২ সালে চলে যান প্যারিসে। সেখানে ইউটিউবে নিয়মিত সৌদি রাজপরিবারের নানান গাল গপ্প প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁকেও বার্তা ও লোক পাঠিয়ে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। দেশটির একজন উপমন্ত্রী তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে, ‘রাজ পরিবার তার জন্য অপেক্ষায় আছে। তুর্কি বিন বান্দার বলেন, অপেক্ষায় থাকেন। তোমরা বেশ্যার সন্তান...। মন্ত্রী বলেন, সুলতান বিন তুর্কির মতো কিছু ঘটবে না। তারা তোমাকে ছোবেও না। আমি তোমার ভাই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাদের পাঠানো হয়েছে।’ কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় আসেননি। এসেছেন অপহরণ হওয়ার পর।

২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তুর্কি বিন বান্দার ইউটিউবে পোস্ট দিতে থাকেন। এরপরই জুলাইয়ের শেষ দিকে হঠাৎ তিনি নাই হয়ে যান। তারপর এখন পর্যন্ত রাজপুত্র তুর্কি বিন বান্দারের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

যুবরাজ তুর্কি বিন বান্দারের খুব কাছের বন্ধু ওয়েল আল-খালাফ। ব্লগার ও অনলাইন কর্মী বলেন, বিন বান্দারের সঙ্গে প্রতি এক বা দুই মাস পর কথা হতো। তার অপহরণের পর ৪/৫ মাস আমি কিছুই বুঝছিলাম না, আসলে কি ঘটেছে। একদিন রাজ পরিবারের একজন কর্মকর্তার বললেন, তুর্কি বিন বান্দার আমাদের সঙ্গেই আছেন। তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ওয়েল আল-খালাফ বলেন, অনেক দিন পরই তুর্কি বিন বান্দারকে নিয়ে একটি খবর পড়ি মরক্কো এক পত্রিকায়। সেখানে বলা হয়, তিনি মরক্কো থেকে ফ্রান্সে ফিরবেন। সেখানে তিনি মরক্কোর কারাগারে ছিলেন। তবে এরপর সৌদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে মরক্কোর আদালত তুর্কি বিন বান্দারকে দেশটিতে ফেরত পাঠায়।

এরপরই তুর্কি বিন বান্দারের কি হয়েছে তা জানা যায়নি। তুর্কি বিন বান্দার সৌদি আরবে যাওয়ার আগেই বন্ধু ওয়েল আল-খালাফকে তার লিখিত ও অপ্রকাশিত একটি বই দিয়ে যান। বইয়ের সঙ্গে ছিল কিছু বার্তাও।

তুর্কি বিন বান্দার বার্তায় লেখেন, ‘প্রিয় খালাফ তুমি যখন এই বার্তা পাবে ততক্ষণে আমি হয়তো অপহরণ অথবা গুপ্ত হত্যার শিকার হতে পারি। এরা সবাই সৌদির লোক।’

রাজপুত্র সউদ বিন সাইফ আল-নাসের। ছবি: বিবিসি

সউদ বিন সাইফ আল-নাসের

তুর্কি বিন বান্দারের নিখোঁজ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে একই পরিণতি ভোগ করতে হয় আরেক রাজপুত্র সউদ বিন সাইফ আল-নাসেরকে। ২০১৪ সাল থেকে টুইটারে সৌদি রাজতন্ত্রকে কটাক্ষ করে নানান পোস্ট দেওয়া শুরু করেন ইউরোপের ক্যাসিনো ও হোটেল ব্যবসায়ী সউদ। সউদ বিন সাইফ আল-নাসের টুইটারের সৌদি নাগরিকদের রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে তার টুইটার অ্যাকাউন্টটি আর সচল পাওয়া যায়নি। তারও আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়া আরেকজন সৌদি রাজপুত্র খালেদ বিন ফারহানের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক বৈঠকের কথা বলে কৌশলে সউদকে রিয়াদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খালেদ বলেন, সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা করা আমার চারজনই ছিলাম ইউরোপে, যাদের মধ্যে তিনজনকেই অপহরণ করা হয়েছে। খালেদ বিন ফারহান মনে করেন, সউদ বিন সাইফ আল-নাসেরের ভাগ্য তুর্কি বিন বান্দারের মতোই হয়েছে।

সৌদি রাজপুত্র খালেদ বিন ফারহান বলেন, ‘একটি প্রাইভেট বিমানে করে প্রিন্স সউদকে অপহরণ করা হয়। তাঁকে নিয়ে বিমানটি রোমে নয় রিয়াদে পৌঁছায়।’ তিনি দাবি করেন, সৌদি গোয়েন্দারা এ ঘটনাকে অন্য কিছু চালিয়ে দিয়েছে।

সৌদি রাজপুত্র খালেদ বিন ফারহান। ছবি: বিবিসি

রাজপুত্র খালেদ আশঙ্কা করছেন অদূর ভবিষ্যতে তাঁকেও অপহরণ করা হতে পারে। তার ভাগ্যও পূর্বের তিনজনের মতো হতে পারে। তিনিই হয়তো সৌদির পরবর্তী লক্ষ্যে।

২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে ব্যক্তিগত কাগজপত্র আনার প্রয়োজনে ঢোকার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন সৌদির খ্যাতনামা সাংবাদিক জামাল খাসোগি। শুরু থেকে তুরস্ক দাবি করে আসছে, খাসোগিকে কনস্যুলেট ভবনের ভেতর সৌদি চরেরা হত্যা করেছে। গত বছর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা গ্রহণের পর রোষানলে পড়েন খাসোগি। তিনি দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ওয়াশিংটন পোস্টে যুবরাজ মোহাম্মদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে একের পর এক কলাম লেখেন। অভিযোগ উঠেছে, যুবরাজের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ হত্যা সংঘটিত হয়েছে। ১৭ দিন পর জামাল খাসোগিকে ইস্তাম্বুল দূতাবাসে হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় সৌদি আরব। এটা নিয়ে বিশ্বে নানান সমালোচনার মুখে পড়েন সৌদি রাজপরিবার। ক্ষোভ বাড়তে থাকে বিশ্বে। তবে সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা এর আগে বলেছেন, খাসোগি হত্যার পুরো অপারেশন নিয়ে কিছু জানতেন না যুবরাজ। তিনি অবশ্য কাউকে অপহরণ অথবা হত্যার নির্দেশ দেননি। তিন সপ্তাহ ধরে এই সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে খাসোগির পরিণতি নিয়ে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করে সৌদি আরব। প্রথমে তারা তার হত্যার ঘটনা অস্বীকার করে। তারপর বলে, কনস্যুলেটের ভেতরে হাতাহাতির একপর্যায়ে তিনি মারা গেছেন। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ