বিদেশে যাচ্ছে দেশি রোবট

November 8, 2018, 10:17 AM, Hits: 120

বিদেশে যাচ্ছে দেশি রোবট

 হ বাংলা নিউজ : বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রোবট রপ্তানি! শুনেই চমকের ধাক্কা। তবে এটাই এখন বাস্তব। এর মূলে রয়েছেন এক দম্পতি—রিনি ঈশান ও রাকিব রেজা। তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেটার লিমিটেড’ বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছে রোবট। এই প্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে ২৮টি রোবট। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বানানো হয়েছে ১১টি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রথম রোবট রপ্তানি করে চলতি বছরের জুলাই মাসে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সলিউশনব্যাংক প্লাস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে এই রোবট পাঠানো হয়। রোবটটি ছিল ত্রিমাত্রিক কংক্রিট প্রিন্টার রোবট। এটি নকশা অনুযায়ী কংক্রিট দিয়ে ত্রিমাত্রিক স্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টার দিয়ে সাধারণত প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যাদি প্রিন্ট করা হয়; কিন্তু এই রোবট কংক্রিটের স্থাপনা প্রিন্ট করতে সক্ষম। এই রোবটের রপ্তানিমূল্য ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা (প্রায় ২ হাজার ১০০ ডলার)।

এই রোবট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী রিনি ঈশানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। পড়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে। অবশ্য আদি বাড়ি ফরিদপুর। 

সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান ও গৃহিণী ফরিদা জামানের মেয়ে রিনির ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আর রোবটের পাঁড় ভক্ত ছিলেন। নিজের মধ্যে তৈরি হয় রোবট নিয়ে কাজ করার আগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে পূর্ণতা লাভ করে তা। ২০১০ সালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় থেকে রোবট নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০১১ সালে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় রাকিব তৃতীয় ও রিনি চতুর্থ হন। সেই পথচলা শুরু। ২০১৩ সালে রিনি মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসার রোবট তৈরির প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এর মধ্যেই গড়ে তোলেন প্ল্যানেটার লিমিটেড। 

রাকিব এখন রোবট নিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেই সুবাদে রিনিকে এখন চট্টগ্রাম ও যুক্তরাষ্ট্রে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। কারণ রিনিদের প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যালয় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। এখান থেকেই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের দলে এখন নয়জন গবেষক রয়েছেন।

রিনি এখন রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে। তাঁর সঙ্গে কথা হয় ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে। জানান তাঁর স্বপ্ন, রোবট নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির জন্যও রোবট তৈরি করেছে প্ল্যানেটার। ২০১৬ সালের মার্চে রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে একটি সম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট বিক্রি করা হয়। রোবটটি ইমেজ প্রসেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওষুধের বাক্স নিরীক্ষা করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব তথ্য হালনাগাদ করে। এই প্রক্রিয়ায় রোবটটি খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নিরীক্ষণকাজ সম্পাদনে সক্ষম। এই ধরনের দুটি রোবট বিক্রি করা হয়।

এর সঙ্গে রিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) মেকাট্রনিক্স ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমআইই) বিভাগের কাছে দুটি রোবটিক হাত বিক্রি করেছি। এই রোবটিক হাত দুটো শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাসে ব্যবহার করা হয়।’

প্ল্যানেটার ২০১২ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের রোবট তৈরি করে আসছে। ছোট রোবটগুলো শিক্ষা–সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত রোবটের নকশাও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে রেখা অনুসরণকারী রোবট, মেঝে মোছার রোবট, দুপায়ে হাঁটতে সক্ষম রোবট, রোবটিক হাত ও গরিবট বা গরিবের রোবট । 

গরিবের রোবট সেটা আবার কেমন? রিনি বলেন, ‘যখন শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করতে লাগল, ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রোবট তৈরি করা খুবই ব্যয়বহুল তখন আমরা এই গরিবটটি আবিষ্কার করি। এটি শিক্ষার্থীদের সাতটি ভিন্ন ধরনের রোবট একটি মাত্র কাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে খুব কম খরচে তৈরি করতে সহায়তা করে। এই কম খরচের জন্যই রোবটটির নাম গরিবট রাখা হয়েছে।’ 

রিনি আরও জানান, ইরা নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট তৈরির জন্য তাঁরা আইসিটি উদ্ভাবনী অনুদান পেয়েছেন। রোবটটি বাংলাদেশের আইসিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করতে রাশিয়ায় একটি সরকারি সফরে অংশ নেয়।

প্ল্যানেটারের প্রথম বাণিজ্যিক রোবট ছিল রিরা টেলিপ্রেজেন্স রোবট। রোবটটি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি করা হয়নি। এই ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক (আইওটি) রোবট বাড়ি ও অফিসের কাজ সম্পাদন করতে পারে। একটি চলমান সিসি ক্যামেরার মতোও কাজ করে। পাশাপাশি এটি কণ্ঠস্বর ও মুখভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগে সক্ষম। রিরা প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে তাঁদের দেড় বছর সময় লেগেছে।

টেলিপ্রেজেন্স রোবট দূর থেকেই ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। মুঠোফোনের ইন্টারনেট দিয়ে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায় খুব সহজেই! রিরার পর্দায় আপনাকে যেমন অন্যরা দেখতে পাবেন, তেমনি আপনিও দেখা পাবেন অন্যদের। অনেকটা মুঠোফোনে ভিডিও কলের মতো। তবে এই পদ্ধতির সঙ্গে রিরার পার্থক্য হলো, এটা হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে না। যে কেউ দেশের বাইরে থেকেও এটিকে সব জায়গায় ঘোরাতে পারবেন! যেখানে আলাদা জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগাতে হয়, সেখানে রিরা সব জায়গায় চলাচল করতে পারে।

কর্মজীবী একজন মায়ের প্রায় আট-নয় ঘণ্টা কেটে যায় অফিসেই। এর মধ্যে বাসায় রেখে আসা বাচ্চাটার জন্য চিন্তা কি কম? ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করল কি না, ঘুমাল কি না—সবকিছুই খেয়াল রাখতে হয়। রিরাকে ব্যবহার করে বাচ্চার সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি, বাচ্চার দেখভালও করা সম্ভব।

প্ল্যানেট ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা রাকিব রেজা জানালেন, কল–কারখানা, বড় বড় দোকান-শপিং মলেও ব্যবহার করা যাবে এই রোবটকে। কিন্তু মাত্র একজন ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত নজরদারির জন্য রোবটটি কেনেন। এটির দাম ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

দেশে রোবটের বাজার সম্পর্কে রিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে একধরনের প্রযুক্তিগত অদূরদর্শিতা প্রত্যক্ষ করেছি। যখন আমরা মানুষকে অত্যাধুনিক রোবট প্রদান করতে চেয়েছি, খুব কম মানুষই এটি বুঝতে পারে এবং ব্যবহার করতে সাহস করে। সুতরাং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের ব্যাপারে মানুষের চিন্তাধারার উন্নয়নের ওপর ব্যাপক হারে বাণিজ্যিক রোবটের বিক্রি নির্ভর করছে।’

তবে আশার কথাও বলেন রিনি—হয়তো এই ধারণা খুব দ্রুত বদলাবে। উন্নত রোবটিক প্রযুক্তি সব শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।’ 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ