কমিক দুনিয়ায় চমকে দেওয়া হিরো স্ট্যান লি!

November 15, 2018, 12:57 PM, Hits: 564

 কমিক দুনিয়ায় চমকে দেওয়া হিরো স্ট্যান লি!

হ বাংলা নিউজ :  নাহ্, তিনি ব্রুস লির আত্মীয় নন। হংকংয়ের কিংবদন্তি এই মারকুটের মতো মার্শাল আর্টেও দক্ষ ছিলেন না। ছিলেন না কোনো সিনেমার নায়কের চরিত্রে। কিন্তু অনেক নায়ক সৃষ্টি করেছেন। সেই নায়কদের নানা কীর্তিকলাপ একসময় শুধুই ছাপাখানা থেকে বের হতো। ধীরে ধীরে রুপালি পর্দায় রাজত্ব বিস্তার করেছে স্ট্যান লির তৈরি সুপারহিরোরা। কমিকস আর হলিউড মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা করছে তারা।

স্ট্যান লির পুরো নাম স্ট্যানলি মার্টিন লাইবার। ব্রুস লির সঙ্গে এই লির একটি জায়গায় মিল আছে। দুজনই কর্মক্ষেত্রে নিজেদের নামে কিছুটা অদলবদল করেছিলেন। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম বদলের পর মার্শাল আর্টের গুরু ও বিখ্যাত মুভি স্টার হিসেবে ‘ব্রুস লি’ নামটিই পরিচিতি পায়। ব্রুসের পরিবারপ্রদত্ত নামটি বেশ বড়সড় এবং কিছুটা কাঠখোট্টা। ঠিক সেভাবেই স্ট্যানলি হয়ে যায় স্ট্যান লি। পরিবর্তিত নামে এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে যান ‘মার্ভেল কমিকস’–এর এই কর্তা যে শেষমেশ আইনিভাবে সিদ্ধ করতে হয়েছিল নতুন নামটি।

নতুন নতুন সুপারহিরোদের আবির্ভাব ঘটিয়ে লি সৃষ্টি করেন ‘মার্ভেল এজ অব কমিকস’। আয়ের দিক থেকে ব্যাটম্যান-সুপারম্যানদের ছাড়িয়ে গেছে অ্যাভেঞ্জারস-আয়রন ম্যানরা। 

বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, ১৯২২ সালে আমেরিকায় স্ট্যান লির জন্ম। দরিদ্র ইহুদি পরিবারে জন্ম নিয়ে শৈশব থেকেই সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। বিরূপ পরিস্থিতিতে লড়ে যাওয়ার সেই প্রত্যয় থেকেই হয়তো লড়াকু সুপারহিরোদের চরিত্র সৃষ্টিতে উৎসাহী হয়েছিলেন তিনি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কমিকস লেখা শুরু করেছিলেন স্ট্যান লি। সেটি ১৯৪১ সালের ঘটনা। বাকিটা ইতিহাস। কাজ শুরুর এক বছরের মাথায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের সম্পাদক হয়েছিলেন স্ট্যান লি! শুরুতে যে টাইমলি পাবলিকেশনসে কাজ জোটাতে গলদঘর্ম হতে হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানকে ‘মার্ভেল কমিকস’–এ পরিণত করেন স্ট্যান, যা কিনা কমিক বিশ্বের ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছে।

স্ট্যান লির সৃষ্ট চরিত্র কত? কমিকবুকের হিসাব অনুযায়ী, সংখ্যাটি শতাধিক। ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’, ‘স্পাইডারম্যান’, ‘অ্যাভেঞ্জারস’, ‘এক্স ম্যান’, ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’, ‘আয়রন ম্যান’, ‘ডেয়ারডেভিল’, ‘হাল্ক’, ‘থর’—স্ট্যান লির তৈরি সুপারহিরোর তালিকা বেশ লম্বা। শুধু হিরো নয়, আলোচিত অনেক ভিলেন চরিত্রও তৈরি করেছেন তিনি। এক কথায়, গত শতাব্দীর ষাট, সত্তর ও আশির দশকের কমিক জগতের বেশির ভাগ চরিত্রকেই কালি ও কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন এই ব্যক্তি। আর তাতে আলোকিত হয়েছে শিশুদের শৈশব। একপর্যায়ে শৈশবের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর রচিত কমিকস গেছে বহুদূর। মূলত, শিশুদের জগৎ থেকে সব বয়সের মানুষের মধ্যে কমিকসকে জনপ্রিয় করে তোলার নেপথ্যের কারিগর লি।

সুপারহিরো থরকে নিয়ে তৈরি সিনেমার একটি দৃশ্য। শুধু সিনেমা বানিয়েই এ যাবৎ বিশ্বজুড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে মার্ভেল। 

তবে কমিক লেখা শুরুর পর থেকেই যে লির জীবন প্রাপ্তিতে ভরে গেছে, তা কিন্তু নয়। হোঁচট খেতে হয়েছে অনেকবার। সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন বয়স চল্লিশের কোঠায় আসার পর। তত দিনে ২০ বছর ধরে কমিক লেখার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে তাঁর। এতেই তাঁর মনে হচ্ছিল, কমিক লেখার জন্য বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে! ঠিক সেই সময়ই পাশে পেয়েছিলেন স্ত্রী জোয়ানকে। সহধর্মিণী বলেছিলেন, কমিক লেখার ক্ষেত্রে লি যেন নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেন। তাতেই যেন সঠিক পথের দিশা খুঁজে পান লি। লিখে ফেললেন নতুন ধারার কমিকস ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’। ১৯৬১ সালের এই ঘটনাই তৎকালীন বাজারের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ‘ডিসি কমিকস’–এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে মার্ভেলকে। বদলে যায় লির জীবন। বদলে যায় পুরো কমিকশিল্প।

স্ট্যান লি’র সৃষ্ট চরিত্রের সংখ্যাটি শতাধিক। শুধু হিরো নয়, আলোচিত অনেক ভিলেন চরিত্রও তৈরি করেছেন তিনি। স্পাইডারম্যান সিরিজের একটি সিনেমার দৃশ্য

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ডিসি কমিকস’ সেই সময় বাজারে এনেছিল ‘ব্যাটম্যান’, ‘সুপারম্যান’ ও ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’—এই তিন চরিত্র। এগুলোর ব্যবসাও ছিল মার মার কাট কাট। টিকে থাকতে হলে এর জবাব দিতেই হতো তৎকালীন টাইমলি পাবলিকেশনস, তথা মার্ভেলকে। স্ট্যান লি ঠিক সেই কাজই করেছিলেন। আর তাতেই কেল্লা ফতে!

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট বলছে, লি তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন কমিকসের স্বর্ণালি যুগে। মার্ভেল যখন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি, তখন কমিকসে ছিল কিছুটা ভাটার টান। কিন্তু নতুন নতুন সুপারহিরোর আবির্ভাব ঘটিয়ে লি সৃষ্টি করেন ‘মার্ভেল এজ অব কমিকস’। এর তোড়ে এখন তো প্রায় ভেসেই গেছে ‘ডিসি কমিকস’! আয়ের দিক থেকে ‘ব্যাটম্যান’-‘সুপারম্যান’দের ছাড়িয়ে গেছে ‘অ্যাভেঞ্জারস’-‘আয়রন ম্যান’রা। শুধু সিনেমা বানিয়েই এযাবৎ বিশ্বজুড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে মার্ভেল। গার্ডিয়ান বলছে, লির নিজস্ব সম্পদের পরিমাণ পৌঁছে গেছে ৮০ মিলিয়ন ডলারে। ফোর্বস জানাচ্ছে, এর সঙ্গে ছাপা কমিকস, খেলনা, পোস্টার বিক্রি বাবদ সংখ্যা যুক্ত হওয়ার পর মোট ব্যবসার অঙ্কটি যে আকাশ ছোঁবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্ট্যান লি কখনোই কমিকসের মানের সঙ্গে আপস করতেন না। বেশির ভাগ কমিক চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অন্য আরও শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য হলেন জ্যাক কারবি, স্টিভ ডিটকো, জন রোমিটা প্রমুখ। তাঁরা সবাই মিলেই প্রতিষ্ঠা করেছেন মার্ভেল কমিকসের একাধিপত্য। কিন্তু স্ট্যান লি এঁদের সবার চেয়ে একটু আলাদা। তিনি শুধু যে কমিকসের বাজার সম্প্রসারণ করেছেন, তা–ই নয়, একই সঙ্গে তৈরি করেছেন কমিকস–অনুরাগীদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়। পাঠকদের পাওয়া অজস্র চিঠির জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। ছিলেন বন্ধুবৎসল। ওই সময় সচরাচর কমিক–স্রষ্টাদের দেখা পেতেন না পাঠকেরা। কিন্তু স্ট্যান লি ছিলেন ব্যতিক্রম। পাঠকদের কাছে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি!

প্রশ্ন আসতেই পারে, কেন এত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল স্ট্যান লির সৃষ্টি? আদতে তিনিই প্রথম এমন সুপারহিরো তৈরি করেছিলেন, যাদের জীবন সাধারণ মানুষের মতো সমস্যায় জর্জরিত। সিএনএন বলছে, স্ট্যান লির সুপারহিরোরা সবাই একসময় সাধারণ ছিল, পরে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে অসাধারণ হয়েছে। এই সুপারহিরোরা শুধু পেশিশক্তির অধিকারী নয়, এদের ঘটে বুদ্ধিও আছে। স্ট্যানের ‘এক্স ম্যান’ ও ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ সিরিজে উঠে এসেছিল বৈষম্য ও তার বিরুদ্ধে লড়ার গল্প। ‘আয়রন ম্যান’–এ আবার দেখা যায় পুঁজিবাদ ও অস্ত্র ব্যবসার সখ্য। ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ আবার দেশাত্মবোধকে প্রাধান্য দিয়েছে। এবার আপনিই বলুন, স্ট্যান লির সুপারহিরোদের আশপাশের বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মেলাতে কারও কি অসুবিধে হওয়ার কথা?

পুরো কমিকশিল্পকে আমূল বদলে দেওয়া এই স্ট্যান লি গত সোমবার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। কিন্তু বয়সের এই হিসাব, মার্ভেল অধিকর্তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেয় না। উল্টো আরও কিছুদিন তাঁর ছায়ায় থাকার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে।

স্ট্যান লি শুধু যে কমিকসের বাজার সম্প্রসারণ করেছেন তাই নয়, একই সঙ্গে তৈরি করেছেন কমিকস অনুরাগীদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়। পাঠকদের পাওয়া অজস্র  চিঠির জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। পাঠকদের কাছে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি! 

৭০ বছর ধরে স্ট্যানের জীবনসঙ্গী ছিলেন জোয়ান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, গত গ্রীষ্মে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই শারীরিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন সুপারহিরোদের জনক। আর কয়েক বছর ধরেই চোখে প্রায় কিছুই দেখতেন না তিনি। ২০১৬ সালে রেডিও টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লি জানিয়েছিলেন নিজের আক্ষেপের কথা। বলেছিলেন, বই পড়াটা বড্ড মিস করছেন তিনি!

শেষ করছি স্ট্যান লির একটি কথা দিয়ে। আচ্ছা, সবচেয়ে বড় ক্ষমতা বা সুপারপাওয়ার কী? স্ট্যানের মতে, ভাগ্য। তাঁর জবানিতে, ‘কারণ, যদি আপনার সঙ্গে সৌভাগ্য থাকে, তখন সব আপনার মনমতোই হবে।’

অবশ্য বাবাকে হারিয়ে সন্তানদের (সুপারহিরো) যে দুর্ভাগ্য বরণ করে নিতে হয়েছে, তা নিশ্চিত। ‘আয়রন ম্যান’রা এবার বক্স অফিসে কোনো তালগোল না পাকালেই হয়! তখন কিন্তু ‘মার্ভেলাস’ স্ট্যান লিকে বড্ড মনে পড়বে। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ