বন্ধ জানালা

November 16, 2018, 11:42 AM, Hits: 1008

বন্ধ জানালা

হাসিনা বানু , হ-বাংলা নিউজ : বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা ।প্রায় এক বিঘা জমির উপড়ে অবস্থিত বাড়ীটি ।সামনেই বিশাল ফুলের বাগান, পূবদিকে শব্জী, ফলফলারীর বাগান।বাড়ীটির পশ্চিম দিকে বিশাল এক বড়ই গাছ, আছে এক লেংড়া আমের গাছ আর আছে বক ফুলের কচি বয়সি একটি গাছ। বা দিকের কোল ঘেসে আছে একটি কাগজী লেবু ও এলাচীলেবু গাছের ঝোপ । সাবরীণা এ বাড়ীতেই বড় হয়েছে। লেবুফুলের সুবাষ মেখে, সজনে ডালে লুটোপুটি খেয়ে সে কিশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছে। পূব দিকে তর্ তর্, ছলাৎ ছলাৎ করে বয়ে যাচ্ছে ব্রহ্মপূত্র নদ। এ নদে ছোট বেলায় নৌকা চড়ে বাড়ীর সবাই মিলে বর্ষা কালে কত পিকনিক করেছে–প্রচন্ড খড়ায় পানি শুঁকিয়ে গলে সাতরে ঐপাড়ের চড়ের ক্ষেতের  কত ক্ষিড়াই চুড়ি করেছ !!!! ছোট বেলার সে দিন গুলো ছিল  কত অন্যরকম।

দেশ স্বাধীন হবার পরথেকেই দেখছে মার ঘরের পূবদিকের জানালাদুটো সবসময় বন্ধ থাকে ।সাবরীণার একদম ভাল লাগেনা-। ঘরের জানালা সবসময় খোলা থাকবে, আলোয় আলোয় ভরে থাকবে ঘর। তা না । সাবরীণার মনেহয় এজন্যই মা সবসময় অসুস্থ থাকে( মিসেস হোসেন)। বন্ধ ঘরে আলো আসেনা-বাতাস কম, কিকরে মা এর শরীর ভাল থাকবে?

সাবরীণা একদিন জিদ করে জানালা দুটো খুলতে গিয়েছিল, মিসেস হাসান চিৎকার করে উঠেছিলেন”না না , খুলনা,বন্ধ কর জানালা, আমি তাকাতে পারছিনা, আমিবাইরে তাকাতে পারছিনা—লাশ, লাশ আমার বাগানে শুধু লাশ। শীয়াল কুকুর টেনেটেনে , ছিড়ে খুবলে খাচ্ছে, লাশের পরে লাশ। আমার বাগানের টমেটো গাছের ফাঁকে ফাঁকে মানুষের লাশ-মুক্তি যোদ্ধাদের লাশ। গন্ধ- -আমি এখনও পঁচা লাশের গন্ধ পাই। বন্ধ কর জানালা। নদীতে কোন পানি দেখা যায়নি , শুধু লাশ ভেসে যেতে দেখেছি। আমিতো মতিনকে(মতিন সাবরীণাদের বাজার সরকার ও বাবার পার্সোনাল আরদালি) কতবার বলেছি বাজার থেকে কখনও নদীর মাছ কিনে আনবিনা । ওগুলো মানুষ খেকো মাছ”।

মা-দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল, তুমি কোথাথেকে লাশ দেখো-কোথা থেকে গন্ধ পাও?সাবরীণা মৃদু অনুযোগ করে। মার তীব্র জীদের উপড় জানলাদুটো বন্ধ করেদেয় সাবরীণা ।

ও শুনতে পায় মা বিড়বিড় করে বলছে-১৯৭১–২৫শে মার্চ রাত বাড়টায় পাক হানাদার ঢাকা আক্রমন করলো । ২৬শে মার্চ সকাল ,  আমরা নাস্তার টেবিলে বসে সবাই  অপেক্ষা করছি একসাথে নাস্তা করবো । তোমার বাবা ইউনিভার্সিটির মারকেটে গেছেন। প্রতিদিন সকালেই একবার মারকেটে যান । যদিও ওটা একটা ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজার কিন্তু আদপে এটা একটা রাজনিতির কেন্দ্র বিন্দু। সেখানে ছা্ত্র রাজনিতি , শিক্ষকদের রাজনিতি, কর্মচারিদের সব রাজনিতির চর্চা হয়। সকাল নয়টা নাগাদ তোমার বাবা দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে ফিরলেন।  চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন-“সব শেষ, সব শেষ হয়ে গেছে। পাক হানাদার সারা ঢাকা শহড় কামান দাগিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে। কিচ্ছু নেই আর কিচ্ছু নেই।”” আমি চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম বাচ্চুদার খবর কি?( উল্লেখ্য শহীদ অধ্যাপক, গিয়াসউদ্দীন আহমেদ ইতিহাস বিভাগ , তার ডাক নাম বাচ্চু, সাবরীণার মায়ের পিঠাপিঠি বড়ভাই) তোমার বাবা বললেন জানিনা,জানিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোনবুথ থেকে বহুৎ চেষ্টা করেছি খোঁজ নেবার, কিন্তু সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন। জুন মাসের দিকে পাক হানাদার মুক্তাগাছা ও ঐধার থেকে নেত্রকোনা আক্রমন করে । আমাদের যেহেতু গ্রামের বাড়ী ঢাকায়, ওখনে যাওয়া সম্ভব হয়নি তাই আমরা ত্রীশাল তোমার বাবার অফিসের সোবহান সাহেবের শশুড় বাড়ী আশ্রয় নিলাম। ফিরে এলাম ক্যাম্পাসে জুলাই এর মাঝামাঝি। সমস্ত ক্যাম্পাস থমথমে, পাক বাহিনী ক্যাম্পাসটাকে তাদের ক্যান্টনমেন্ট বানিয়েছে। গেষ্ট হাউস টাকে তাদের প্রধান অফিস বানিয়েছে। গেষ্ট হাউসটি মাত্র আমাদের আটটি বাসাপরেই। ওরা প্রতিদন ধরে আনতো মুক্তিযোদ্ধা, মাঝবয়সি যুবক,বৃদ্ধ আর মেয়ে মানুষ। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর ওরা গুলি করে ওদেরকে ব্রহ্মপুত্রের নদীতে ফেলেদিত। আমরা ক্রমাগত ঠুস ঠাস গুলির শব্দ শুনতে পেতাম।লাশ গুলো ভাসতে ভাসতে কোনটা চলে যেত আরো দূড়ে আর কিছু আমাদের বাসার নদীর কিনাড়ে। শিয়াল কুকুর টেনেটেনে আমাদের বাগানে অন্যান্য বাসার বাগানে নিয়ে এসে ছিঁড়ে খুবলে খেত। সে কি বিভৎস দৃশ্য!!!!!এভাবে আমরা শিয়াল কুকুর আর লাশের সাথে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ছিলাম। কথাগুলো বলতে বলতে মিসেস হোসেন অর্থাৎ সাবরীণার মা মিহি সুরে কাঁদতে লাগলেন–।

সাবরীণা আস্তে করে ঘর থেকে বেড় হয় গেল। ভাবতে লগলো- না , মাকে এভাবে মরতে দেওয়া যাবেনা।মা একটাভয়াবহ ঘোড়ের মধ্যে আছে-তিনি ট্রমাতে ভুগছেন-এথেকে মাকে মু্ক্তি দিতেই হবে। সামনেই আসছে ডিসেম্বর। ১৬ই ডিসেম্বরে দুটো জানালা সে খুলে দেবেই দেবে। সোনালী আলোয় আর সকালের মিষ্টি হাওয়ায় ঘরটা ভরে যাবে।

১৯৭৬, ১৬ ই ডিসেম্বর সকাল বেলা। নদীর পাড়ে বাধাঁনো আমগাছের তলায় বিজয় দিবসের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সকাল ছয়টা থেকে সেতারের সুরের মূর্ছনায় নদীর পাড়টা ভরে উঠেছে।সাবরীণা মায়ের ঘরে ঢুকলো, বলতে লাগলো ‘মা দেখো কিসূন্দর সকাল, আজ বিজয় দীবস” বলেই সটান করে টান দিয়ে জানালা দুটো খুলে দিল। সকালের সোনালী রোদের আলোতে আলোময় হয়ে গেল ঘরটা। মিসেস হোসেন চিৎকার করে উঠলেন-“”না না খুলনা জানালা, স্বাধীন দেশের সূর্য আমি দেখতে চাইনা, স্বাধীন দেশের আলোবাতাসে আমি নিঃশ্বাষ নিতে পারবনা, এ আকাশ আমি চেয়ে দেখতে চাইনা। যে স্বাধীন দেশ দেখার জন্য আমার ভাই( অধ্যাপক শহীদ গিয়াসউদ্দী আহমেদ, ইতিহাস বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রান দয়েছেন, তিনি সেই স্বাধীন বাংলা দেখে যেতে পারেন নি। আমি পারবনা , আমিপারবনা এ নদী , এ দেশ দুচোখ ভরে দেখতে।” বলতে বলতে আর কাঁদতে কাঁদতে মিসেস হোসেন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন।

হাসিনা বানু 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ