রাজশাহীতে হারিয়েছে ৯টি নদী, ১০০ বছর পর একটি উদ্ধার

February 10, 2019, 9:18 AM, Hits: 81

রাজশাহীতে হারিয়েছে ৯টি নদী, ১০০ বছর পর একটি উদ্ধার

হ-বাংলা নিউজ :

 ৯ টি নদীকে বন্যানিয়ন্ত্রণের নামে মেরে ফেলা হয়েছে
• সব কটিই ছিল পদ্মার শাখা নদী
• বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নারদ নদীটিকে উদ্ধারে নেমেছে
• আরও তিনটির উৎসমুখ উদ্ধার করে জীবনদান সম্ভব

রাজশাহীর নয়টি প্রবহমান নদীকে বন্যানিয়ন্ত্রণের নামে মেরে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে বেদখলে মানচিত্র থেকে চিহ্ন মুছে ফেলা এক নদীকে ১০০ বছরের বেশি সময় পর উদ্ধার করা হচ্ছে। এ জন্য পাকা বাড়ি, বিদ্যালয় ও আমবাগানসহ অনেক স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে।

নদীগুলো হচ্ছে নারদ, সন্ধ্যা, স্বরমঙ্গলা, দয়া, বারাহী, হোজা, নবগঙ্গা, চিনারকূপ ও মুসাখান। সব কটিই ছিল পদ্মার শাখা নদী। এর মধ্যে নারদ নদীটিকে উদ্ধার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারদ বাদেও নয়টি নদীর মধ্যে চিনারকূপ, জোহা ও মুসাখানের উৎসমুখ উদ্ধার করে পুনরায় সেগুলোর জীবনদান সম্ভব হবে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) নারদ নদীটিকে উদ্ধারে নেমেছে। তারা উৎসমুখ বাদ দিয়েই অপর একটি খালের মাধ্যমে পদ্মা নদীর সঙ্গে নদীটিকে সংযুক্ত করে দিয়েছে। তিন বছর আগে নদীটির খননকাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে ৪ কিলোমিটার উপশাখাসহ নদীর ৩৪ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। নারদের মোট তিনটি প্রবাহ। প্রথম প্রবাহ রাজশাহীতে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি নাটোরে।

নারদের প্রথম প্রবাহটি রাজশাহী শহর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শাহপুর গ্রামে। পদ্মা নদী থেকে এর উৎপত্তি। শাহাপুর থেকে কাটাখালি, কাপাশিয়া, জামিরা, হলিদাগাছি, মৌগাছি, পুঠিয়ার তাতারপুর, বিড়ালদহ, ভাড়রা ও কান্দ্রা পীরগাছা হয়ে নাটোরের ভেতর দিয়ে নন্দকুজা নদীতে পড়েছে।

বিএমডিএ খননকাজ করার সময় নদীটির উৎসমুখ থেকে খনন না করে রাজশাহীর চারঘাটের মুক্তারপুর এলাকায় পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত পাঁচ কিলোমিটার লম্বা একটি খাল খনন করে উপজেলার হলিদাগাছিতে নারদের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেখান থেকে নারদের ভাটিতে খননকাজ করা হয়েছে। নদীর এই নতুন ধারা মুসাখানের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী সেলিম রেজা জানান, নদীটি প্রায় ১০০ বছর আগে বেদখল হয়ে গিয়েছিল। নদীর তীরবর্তী মানুষেরা নদীটির দখল নিয়ে বাড়িঘর, বাগান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছিলেন। আর এস রেকর্ডে নদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সিএস রেকর্ড দেখে নদীর প্রবাহ খুঁজে বের করা হয়েছে। এরপর নদীর জায়গা পুনরুদ্ধারে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। মন্ত্রী ও সাংসদদের সহযোগিতায় এটা সম্ভব হয়েছে। আটটি পাকা বাড়ি, দুটি স্কুল, অনেক কাঁচা বাড়িঘর ও আমবাগান উচ্ছেদ করতে হয়েছে। এখন শুকনো মৌসুমে এই নদীতে পানি থাকছে। এই পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সন্ধ্যা নদী নারদের একটি শাখা। এর উৎসমুখ পুঠিয়া উপজেলার রঘুরামপুর বাগিচাপাড়ায়। পুঠিয়ার শিবপুর বাজারের পাশ দিয়ে বাঁশপুকুরিয়া, নন্দনপুর হয়ে কান্তার বিলে পতিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। নারদ খননের সময় এই নদীর উৎসমুখের চার কিলোমিটার খনন করা হয়েছে।

রাজশাহী নগরের তালাইমারী এলাকায় ছিল স্বরমঙ্গলা নদীর উৎসমুখ। এই নদীর একটি শাখা ছিল দয়া। এটি নগরের কাজলা-জামালপুর ও নামোভদ্রা এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হতো। এই জামালপুর মৌজায় পড়েছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)। নদীটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়াল বরাবর উত্তর দিকে বয়ে গেছে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়ালের পাশে তাকালে নদীর রেখা বোঝা যায়। রেললাইনের উত্তর পাশে দয়া নদীর খাতটি বেশ স্পষ্টই ছিল। সমতল থেকে ৪ ফুট গভীর ও ২৫ গজ প্রশস্ত এই জলাভূমিতে বছরের ছয় মাস পানি থাকত। এই জায়গাটি এখন ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এর পাশের রাস্তাটি চার লেন করা হচ্ছে। রেলক্রসিংয়ের ওপর ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। এ কারণে নদীর অবশিষ্ট চিহ্নটুকুও ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। তবে এর উত্তর দিকে মেহেরচণ্ডী, খড়খড়ি বাজার, কুখুণ্ডী, বামন শিকড়, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, সারাংপুর এলাকায় নদীর পুরো চেহারা এখনো স্পষ্ট।

পরিবেশবাদী সংগঠন হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ১৮৮৫ সালে কথিত বন্যানিয়ন্ত্রণের নামে পদ্মা নদীর তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তখন নগরের বুলনপুর এলাকা থেকে তালাইমারী পর্যন্ত ১২টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। নদীগুলোর উৎসমুখেও এই স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে নদীগুলোর উৎসমুখ মরে যেতে থাকে। একপর্যায়ে নদীর পরিচয় হারিয়ে যায়। মানুষ ভুলে যায় নদীর নাম।

মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, এই নদীগুলোর হাজার হাজার হেক্টর সরকারি খাসজমি এখনো দখলমুক্ত রয়েছে, যা খনন করে বর্ষার পানি ধরে কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে দয়া ও স্বরমঙ্গলার উৎসমুখ আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, দয়া নদীর যে অংশ ভরাট করা হচ্ছে সেটা ভরাট না করে একটি সাইনবোর্ড দিয়ে নদীর নাম লিখে রাখলে আমাদের হারানো নদীর পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে থাকত। আর খড়খড়ির পর থেকে খনন করলে এই নদীতে বর্ষার পানি ধারণ করে কৃষিকাজ করা যায়। তবে সহজেই উৎসমুখ সংস্কার করে সচল করা যায় চিনারকূপ, মুসাখানকে। আর হোজা নদীকে বরানই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করে দিলেই হয়। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ