তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কার - দেশের অগ্রগতির মূল ভূমিকায় কৃষক

April 6, 2019, 11:15 AM, Hits: 87

তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কার - দেশের অগ্রগতির মূল ভূমিকায় কৃষক

হ-বাংলা নিউজ : স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের যে অগ্রগতি, তাতে প্রধান ভূমিকা কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের। তাঁদের সাফল্যের কারণে খাদ্যঘাটতি থেকে আজ খাদ্যে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও কৃষিতে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে।

আজ শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কার অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। অনুষ্ঠানে কৃষি খাতে সফল উদ্ভাবন, উদ্যোগ এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সম্মানিত করেছে তীর-প্রথম আলো। আট ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কার দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের যে ক্রমবর্ধমান উন্নতি, তাতে একজন নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। এতে কৃষি খাতের যে অবদান, তা আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। দেশের কৃষি খাতকে এ পর্যায়ে এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারা বড় ভূমিকা রেখেছেন।’

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যেসব অগ্রগতি, তার সবচেয়ে বেশি কৃষি খাতে। এই সাফল্যের মূল কারিগর কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, কৃষক ও কৃষি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে অভিনন্দন জানান তিনি। তাঁদের কৃতিত্বের কারণেই বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, গরু-ছাগল উৎপাদনে দ্বিতীয়, মৌসুমি ফলের মধ্যে কাঁঠাল উৎপাদনে প্রথম, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। কৃষকদের সাফল্য বাংলাদেশের বিজয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন)  জাফর উদ্দিন সিদ্দিকী বলেন, কৃষিবিদদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে কাজ করার ফসল এখনকার বাংলাদেশ পাচ্ছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যতটা এগিয়েছে, তার মেরুদণ্ড কৃষক। তিনি আরও বলেন, দেশের কৃষিনির্ভর শিল্পগুলোয় প্রয়োজনীয় সয়া বীজ, গম ও ভুট্টা আমদানি করতে হচ্ছে। এগুলো আমদানি কমাতে পারলে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এসব পণ্য বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় দেশের কৃষি উন্নয়নের পথিকৃৎ, বিজ্ঞানী ও সংগঠক কাজী এম বদরুদ্দোজাকে। প্রতিক্রিয়ায় কাজী এম বদরুদ্দোজা বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও কৃষকেরা যেন দীর্ঘদিন দেশের সেবা করে যেতে পারেন, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তাঁদের সেবায় যাতে দেশের মানুষ উপকৃত হয়, সেই আশা ব্যক্ত করেন প্রবীণ এ কৃষিবিজ্ঞানী।

অনুষ্ঠানে আটটি বিষয়ে পুরস্কার দেওয়া হয়। সেরা কৃষি উদ্ভাবন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন রাজশাহীর তানোরের নুর মোহাম্মদ। স্বশিক্ষিত এই বিজ্ঞানী সংকরায়ণ করে একের পর এক নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবনকে আমলে নিয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরাও। ধানগুলো জাত হিসেবে স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।

সেরা কৃষি উদ্যোগ (ব্যক্তি) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন বান্দরবানের তোয়ো ম্রো। বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়, রুমা, থানচি থেকে ত্রিপুরা ও বমরাও মানুষেরা তাঁকে চেনে তোয়ো মাস্টার হিসেবে। পাহাড়ের জুম চাষিদের যাযাবর জীবন থেকে বাগানের চাষে আসার পথপ্রদর্শক তিনি। তোয়ো বাগান চাষ করে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি অন্যদের শিখিয়েছেন বাগান চাষের কৌশল।

সেরা নারী কৃষক বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছার শাহানারা বেগম। একুশ বছর আগে স্বামী হারিয়ে এক বিঘা জমি ইজারা নিয়ে গ্ল্যাডিওলাস ফুল চাষ শুরু করেন। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সফল হয়েছেন শাহানারা। এখন তাঁর ১০ বিঘা জমি, ১৫ শতক জমিতে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন সুন্দর একটি বসতবাড়ি। এই সময়ে তিনি তাঁর সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। শাহানারা অন্যদেরও শিখিয়েছেন ফুল চাষের কৌশল। সবার কাছে তিনি একটি আদর্শের নাম।

সেরা উদ্যান চাষি হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন চুয়াডাঙ্গার শাখাওয়াত হোসেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মচারী শাখাওয়াতের গাছ লাগানোর শখ তাঁর ভাগ্য বদলে দিয়েছে। মাল্টা চাষ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। মাত্র ২০টি চারাগাছ লাগিয়ে সাফল্যের দেখা পান। এরপর প্রথমে ২০ বিঘা পরে ৪০ বিঘায় সম্প্রসারিত হয় তাঁর বাগান। সেখান থেকে ফল বিক্রির পাশাপাশি চারাগাছও বিক্রি করছেন। তাঁর মাল্টাবাগান এখন চুয়াডাঙ্গায় পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে।

সেরা খামারি (গরু) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন ঈশ্বরদীর আমিরুল ইসলাম। তাঁর তন্ময় ডেইরি ফার্মটি চার বিঘা জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে ১২৯টি গরু থেকে দিনে ৫০০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। গরুর গোবর থেকে তৈরি হয় বায়োগ্যাস। আবার গোবর থেকে তৈরি করা হয় জৈবসার। ১৯৯৪ সালে একটি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করা আমিরুলের খামারের ব্যাপ্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে আরও অনেক খামার।

সেরা খামারি (মৎস্য) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন দাউদকান্দির আলী আহমেদ মিয়াজী। ২০০০ সালে মাত্র তিনটি পুকুর ইজারা নিয়ে দেড় লাখ টাকা পুঁজিতে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালে তাঁর মাছের প্রকল্প এসে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০০ বিঘা জমিতে। এখন প্রতি বছর ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ চাষ হয়, যার বাজারমূল্য ৩২ কোটি টাকা।

সেরা খামারি (পোলট্রি) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা শাহিনুর রহমান। জাতীয় কৃষি পদক পাওয়া এই তরুণের বেড়ে ওঠা অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। খামারের কাজ করতে করতে পড়াশোনা করেছেন।

সেরা কৃষি উদ্যোগ (প্রতিষ্ঠান) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে তিন তরুণের গড়া প্রতিষ্ঠান নগর কৃষি। এই শহরের মানুষকে কৃষিমুখী করতে চান তাঁরা। গাছ কেটে একের পর এক তৈরি হওয়া দালানের ওপর গাছ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চান তাঁরা।

পুরস্কার বিজয়ীরা তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এই পুরস্কার তাঁদের পাশাপাশি সব উদ্যোক্তাকে অনুপ্রাণিত করবে। দেশের কৃষি খাতে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহ দেবে আরও ভালো কাজ করতে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কারের জন্য ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলো পত্রিকা ও অনলাইনে মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়। ৫৬৫টি মনোনয়ন থেকে প্রথম ধাপে ১৩৬টি ও দ্বিতীয় ধাপে ৪৯টি মনোনয়ন বাছাই করা হয়। এগুলো থেকে ২৪টি সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হয়। এসব প্রস্তাব গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিচারকদের চূড়ান্ত সভায় উপস্থাপন করা হয়।

বিচারকমণ্ডলী এসব প্রস্তাব থেকে আটটি ক্যাটাগরিতে আট সেরা উদ্যোগ ও আজীবন সম্মাননা চূড়ান্ত করেন। দেশের খ্যাতনামা নয়জন কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী ও সংগঠক বিচারক হিসেবে ছিলেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুরিবোর্ডের সদস্য সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান, উইন ইন করপোরেটের প্রধান নির্বাহী ড. কাশফিয়া আহমেদ ও বাংলাদেশ বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী সমিতির সভাপতি রাশেদুল করিম প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানের মধ্য দিয়ে। আর শেষ হয় রথীন্দ্রনাথ রায়ের সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ