পাকিস্তানের অর্থনীতি কতটা খারাপ?

April 23, 2019, 1:17 AM, Hits: 132

পাকিস্তানের অর্থনীতি কতটা খারাপ?

হ-বাংলা নিউজ : টিম পাকিস্তানের অধিনায়ক হিসেবে ক্রিকেটার ইমরান খান ৪৮টি টেস্টের ১৪টিতে জিতেছিলেন। হারেন ৮টিতে। এক দিনের খেলাগুলোতেও ম্যাচ রেকর্ড তাঁর পক্ষে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষায় চরম সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাঁকে। যদিও দায়িত্বের নয় মাস পূর্ণ হয়নি, কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অর্থমন্ত্রী আসাদ উমর বাদ পড়েছেন। দেশটির অর্থনীতি ক্রমে নুয়ে পড়ছে বলেই সাক্ষ্য মেলে। ডলারের বিপরীতে রুপির দর গত দেড় বছরে ৩৫ ভাগ পড়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ—প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, কেউই জানে না পরিস্থিতি কতটা খারাপ হবে।

অর্থনীতির এই দশা ইমরান উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এশিয়া নিয়ে এডিবি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে পাকিস্তান সম্পর্কে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এই ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের শেয়ারবাজার গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়ে যায়। ইমরান সরকারের গত আট মাসে ৬২০০ পয়েন্ট পড়েছে পুঁজিবাজারে। বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য আনতে আইএমএফের কাছে আবার ধার চাইছে পাকিস্তান। এ মুহূর্তে এটাই বড় খবর। এটা হবে ১৯৭২ সালের পর আইএমএফের সঙ্গে পাকিস্তানের ১৮তম বোঝাপড়া।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও পাকিস্তানের এই অধ্যায়ে প্রচুর শিক্ষণীয় আছে। কেন একটি দেশকে বারবার আইএমএফের কাছে যেতে হয়, সেটা বোঝা যায় পাকিস্তানকে দিয়ে। যেমনটি গেছে বাংলাদেশও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০ বার।

ইমরানের নৈতিক পরাজয়?

ইমরান বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোকে খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরতেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে অল্প সময়েই বাস্তবতাটি বুঝতে পারলেন। নতুন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আবদুল হাফিজ শেখ বিশ্বব্যাংকেই কাজ করতেন। পিপলস পার্টির সরকারের সময় এবং জেনারেল মোশাররফের আমলেও তিনি মন্ত্রী ছিলেন।

আবদুল হাফিজ শেখ কোনো নির্বাচিত ব্যক্তি নন। পিটিআই সরকারে যুক্ত হওয়ার সময় দলটির সদস্যও ছিলেন না। ফলে বার্তাটি দাঁড়াচ্ছ, ক্ষমতাসীন তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) দেড় শতাধিক জনপ্রতিনিধি থাকার পরও সেখানে অর্থনীতি চালানোর মতো কাউকে পেলেন না ইমরান খান। এটা দলটির বড় এক ব্যর্থতার দিক। এটা ইমরানের জন্য নৈতিক পরাজয়ও। একদা সামরিক শাসকের সহযোগী ছিলেন—এমন ব্যক্তিদেরই বেছে নিতে হচ্ছে তাঁকে সরকার পরিচালনার জন্য।

‘অধিনায়ক ইমরান’ রাজনীতির ইনিংসে প্রথম আট মাসের ফলাফলের দায়িত্ব নিতেও অনিচ্ছুক। অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্য দোষারোপ করছেন মূলত মন্ত্রীদের। অথচ তিনি প্রায় রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে দেশ চালিয়েছেন এত দিন। সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে পার্লামেন্টের সর্বমোট ৩৪টি সেশনে ইমরান উপস্থিত ছিলেন ছয় দিন। সংসদীয় গণতন্ত্রে পার্লামেন্টের ৮২ শতাংশ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি অবশ্যই খারাপ নজির।

ইমরানের মন্ত্রিপরিষদ থেকে আসাদ উমরের বিদায় এমন সময় ঘটল, যখন সংসদে বাজেট অধিবেশন আসন্ন। গত সাত মাসে চীন ও সৌদি আরব থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আনার পরও উমরকে মন্ত্রিসভা ছাড়তে হলো। এটাই ইঙ্গিত দেয়, অর্থনীতি বাঁচাতে দেশটিতে ধারকর্জের ক্ষুধা কত তীব্র।

২০১২ সালে ইমরানের সঙ্গে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে আসাদ উমর ছিলেন পাকিস্তানের সফল করপোরেট বসদের একজন। বেসরকারি জগতে তিনি সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন বলে জনশ্রুতি আছে। তবে সাত মাসের কার্যকালে উমর প্রমাণ করে গেলেন, তৃতীয় বিশ্বে বেসরকারি সংস্থায় দক্ষতা প্রদর্শন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে সফল হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। বিদায় নেওয়ার আগে শেষ টুইটার বার্তায় তিনি পাকিস্তানের জন্য ইমরানকেই ‘সবচেয়ে বড় আশার জায়গা’ হিসেবে উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু এমন মানুষ পাকিস্তানে খুব কম, যারা বিশ্বাস করে, ইমরান দেশটির শিল্পমালিক, ভূস্বামী এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবেন বা তাঁর আদৌ সে রকম ইচ্ছা আছে। তবে তিনি প্রভাবশালীদের অর্থ পাচার বন্ধ করতে আগ্রহী। বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয় পাকিস্তান থেকে।

অনেক ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছে ইমরানকে

পাকিস্তানে জরুরি করণীয় খুব বেশি এবং ইমরান প্রতিশ্রুতিও দিয়ে ফেলেছেন বিস্তর। ক্ষমতায় এসে বুঝতে পারছেন, এই ব্যবধান কমানো সহজ নয়। বিশেষত, এমন একজন শাসকের জন্য সত্যি তা কঠিন, যিনি জনপ্রিয় থাকতে আগ্রহী। ইমরানকে একসঙ্গে অনেক ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছে। রাজনীতিতে পাঞ্জাবের শরিফ এবং সিন্ধের ভুট্টোদের কোণঠাসা রাখা এবং আঞ্চলিকভাবে ভারতকে সকাল-সন্ধ্যা মোকাবিলা করা সহজ নয়। আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তও তাঁর জন্য দুর্ভাবনার বিষয়।

সেনাবাহিনী এখনো তাঁর ‘বন্ধু’। কিন্তু যখনই কোনো ক্ষেত্রে সেনাস্বার্থ ও জনস্বার্থের মধ্যে একটিকে বাছাইয়ের ব্যাপার আসছে, তখন তাঁকে বিব্রত হতে হচ্ছে। তুমুল কাটছাঁটের মধ্যেও দেশটির বিপুল সামরিক বাজেট কমানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। এটা শুধু ভারতের কারণেই নয়, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের উদীয়মান সশস্ত্রতার জন্যও।

বেলুচিস্তানে ইরানবিরোধী গেরিলারা সৌদি সমর্থনপুষ্ট বলে মনে করা হয়। ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তার কারণে ইমরানের পক্ষে সৌদিদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে আঘাত করা কঠিন। কিন্তু ইরানকে শত্রু বানানো পাকিস্তানের জন্য আত্মঘাতী। সে জন্যই তিনি এ সপ্তাহে ইরান গিয়েছিলেন দুদিনের জন্য। একই এলাকায় বালুচ জাতীয়তাবাদীরা চীন-পাকিস্তান করিডরের কাজে ব্যাপক সমস্যা তৈরি করছে। এতে তার পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। ইরানের সহায়তা ছাড়া বালুচ সংগঠনগুলোকে কোণঠাসা করা কঠিন।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বালুচদের মতোই পাকিস্তানি তালেবানরাও বড় হুমকি। এদের ওপর চড়াও হওয়াও ইমরানের জন্য সহজ নয়। কারণ, তারাও ইমরানের সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। এরূপ ভোটব্যাংককে খুশি করতেই ইমরান তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ থেকে একদা আতিফ মিয়াকে বাদ দিয়েছিলেন তাঁর আহমদিয়া বিশ্বাসের কারণে।

আইএমএফের কঠিন শর্তের জালে পড়তে যাচ্ছে পাকিস্তানিরা

এটা প্রায় নিশ্চিত, নতুন করে ঋণের পাশাপাশি আইএমএফের কঠিন শর্তের জালেও পড়তে যাচ্ছে পাকিস্তান। এর মধ্যে একটা হবে রুপি-ডলার বিনিময় হারকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে চায় আইএমএফ। এর ফলে রুপির দর আরও পড়বে। তাতে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। জনগণের জন্য সেটা হবে বিরক্তিকর।

পাশাপাশি ইমরানকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর বাড়াতে হবে। কমাতে হবে ব্যয় বরাদ্দ। জ্বালানি খাতে সরকার আর তেমন ভর্তুকি দিতে পারবে বলে মনে হয় না। নতুন অর্থ উপদেষ্টা আসন্ন বাজেটে দেশবাসীকে ৬০০ বিলিয়ন রুপির নতুন করারোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অসহনীয় এসব পদক্ষেপ ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা আবার আইএমএফ প্রতি তিন মাস অন্তর যাচাই করবে।

‘সংস্কারমূলক’ এসব কাজ যত সহজে অনির্বাচিত ব্যক্তি হিসেবে অর্থ উপদেষ্টা আবদুল হাফিজ শেখ করতে পারবেন, তত সহজে সেগুলোর পক্ষে জনসমর্থন আদায় করতে পারবে না পিটিআইয়ের জনপ্রতিনিধিরা। এভাবেই রাজনীতিবিদ ইমরানের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ হয়ে গেল।

আইমএফ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, আসন্ন দুই বছর পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেই থাকবে। ২০১৮ সালের শুরুতে নির্বাচনী জনসভাগুলোয় ইমরান যে ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন,Ñআইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী একদম তার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এত অল্প প্রবৃদ্ধিতে তিনি কীভাবে চীনের বিপুল ঋণ শোধ করবেন, তা অনুমান করাও দুঃসাধ্য।

পূর্ববর্তী শাসকদের সঙ্গে ইমরানের তফাত পাওয়া যাচ্ছে না

কেবল অর্থনীতিই নয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ‘টিম ইমরান খান’-এর সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। চোরাগোপ্তা হামলায় প্রায়ই বিপুল মানুষ মারা পড়ছে। বিশেষ করে শিয়া হাজারারা।

পিটিআইয়ে ওপরের স্তরে উপদলীয় সংঘাতও তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী থেকে ছুটে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে দল গঠনের এটাই বড় সমস্যা। আসাদ উমরের সঙ্গে ইমরানের সাত বছরের রাজনৈতিক সম্পর্কের তিক্ত সমাপ্তি তার বড় প্রমাণ। যতই বিভিন্ন ফ্রন্টে চাপে পড়ছেন, ততই ইমরান প্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদে অধিকতর অনুগতদের কাছে টানছেন, যা কেন্দ্রীভূত শাসন সংস্কৃতিকেই পোক্ত করছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ পাঞ্জাবে পুলিশের আইজি পদে গত আট মাসে চারবার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। এটা সাক্ষ্য দিচ্ছে,Ñপিটিআই ‘নিজেদের লোক’ খুঁজতে গিয়ে আমলাতন্ত্রে কীরূপ অস্থিরতা কায়েম করেছে।

পাকিস্তানের মানুষ অবশ্য এ রকম শাসনেই আছে গত সাত দশক। যদিও দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই এখনো তাঁর বিরুদ্ধে, কিন্তু জিয়া-উল-হক, জারদারি বা নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ইমরান খানের কোনো তফাত দেখা যাচ্ছে না আপাতত।

এরূপ শাসকদের কারণেই সাধারণ পাকিস্তানিদের বহুবার আইএমএফের যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। ২০১৩ সালেও দেশটি ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার শর্তযুক্ত ঋণ নেয়। তথাকথিত ‘কাঠামোগত সংস্কার’-এর বয়স ৩০ বছর পেরোল পাকিস্তানে। কিন্তু এখনো কেন অর্থনীতি টানাপোড়েনমুক্ত নয়, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই দেশটিতে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ