বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ ও একটি জাতীয় ব্র্যান্ড নামের প্রস্তাব

July 12, 2019, 9:35 AM, Hits: 381

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ ও একটি জাতীয় ব্র্যান্ড নামের প্রস্তাব

দেলোয়ার জাহিদ, হ-বাংলা নিউজ : জাতি হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড উপলব্ধিতে  দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রভাব রয়েছে। বঙ্গবন্ধু'র সোনার বাংলাদেশ হতে পারে ব্র্যান্ড নামের একটি ভাল প্রস্তাব যা নিয়ে বাংলাদেশকে পর্যটনের বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড তৈরি করতে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ যা একদা ছিল একটি স্বপ্ন  তা এখন বাস্তবতায় পরিণত হবার পথে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামী পর্যটনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইসলামী পর্যটনকে ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলতে সার্বিক প্রয়াস ও রোডম্যাপের প্রয়োজন অতিজরুরি। কারণ এর বাজার বার্ষিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়ে ২০২১ সাল নাগাদ তা ২৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে।’

তিনি  ১১ জুলাই, ২০১৯ রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ঢাকা দ্য ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯’ উদযাপন উপলক্ষে দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর ইসলামী পর্যটনকে বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত করার এ আহ্বান বাংলাদেশের নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড নামের উপলব্ধিতে খোরাক যুগিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওআইসি সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ ওআইসি’র সদস্যপদ লাভ করে।

তখন থেকে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা, অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদি ইসলামী মূল্যবোধ অনুসরণে মুসলিম একতা ও সংহতি সুপ্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বাসস পরিবেশিত খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ এবং রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ পর্যটন স্পটের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখ- সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, প্রাচীন ও আধুনিক প্রতœতাত্ত্বিক ও ইসলামীক স্থাপনা ইত্যাদি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় চারশত বছরের প্রাচীন শহর ঢাকা গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। এখানে রয়েছে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, ঢাকার অদূরের পানাম নগরসহ উল্লেখযোগ্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন।’

তিনি বলেন, ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম-এর নকশা পবিত্র মক্কা নগরীর কাবা শরীফের আদলে তৈরি করা হয়েছে। শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ঢাকায় রয়েছে বিখ্যাত আর্মেনিয়ান গির্জা, ঢাকেশ্বরী মন্দির, প্যাগোডা এবং রোজ গার্ডেন সহ সুন্দর সুন্দর স্থাপনা।

বাংলাদেশ মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সৌহার্দ্য ও সমৃদ্ধি রক্ষায় সব সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হজ্জের পর মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত যা ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে পরিচিত তা প্রতিবছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, নগর হিসেবে ঢাকা শুধু পুরানো নয়, এই নগরকে ঘিরে শিল্পী বা সৃজনশীল মানুষের বিপুল সমাবেশ হয়েছিল। যেমন ঢাকার মসলিন, যা সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত ছিল। বর্তমানে ভৌগোলিক নির্দেশক অর্জন করায় ঢাকার জামদানী শাড়ি সারাবিশ্বে আমাদের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাদপীঠ হিসেবে ঢাকার ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী বইমেলা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাংলা বর্ষের প্রথম দিন ‘নববর্ষ’ জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। একইসঙ্গে সুস্বাদু খাবার এবং আতিথেয়তার জন্যও ঢাকার সুনাম রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের শুরুতে ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার শহর ঢাকায় ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আগমনের জন্য তাদের প্রতি শুভেচ্ছা জানান এবং ২০১৯ সালের জন্য ওআইসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের পর্যটন নগরী হিসেবে ঢাকাকে নির্বাচিত করায় কৃতজ্ঞতা এবং আনন্দ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন,একইসঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের পর্যটন মন্ত্রীদের ১০ম সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুই বছরের জন্য চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করছে। ওআইসি ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের পর্যটন শিল্পের বিকাশে শেখ হাসিনা তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা পুণর্ব্যক্ত করেন।

তিনি এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় ৪ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং সম্ভ্রমহারা ২ লাখ মা-বোন এবং ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের সকল শহীদকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

বাংলাদেশের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলিতে জোর দেয়া, দেশের খ্যাতি ও পণ্যগুলির প্রতীকী পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খ্যাতি বাড়ানোর স্বার্থে কর্পোরেট মার্কেটিং এর ধারণা এবং অন্যান্য দেশগুলির কৌশলগুলি পরিক্ষন ও পর্যবেক্ষন করে পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

জাতি ব্র্যান্ডিং একটি উন্নয়নশীল ক্ষেত্র যা দেশের পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ একটি ঐক্যবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামোর তৈরীর জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারেন। অনেক দেশ তাদের দেশের স্থায়ীত্বকে উন্নত করার লক্ষ্যে কাজ করে,  জাতির খ্যাতির একটি চিত্র তার অর্থনৈতিক জীবনকে নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত করতে পারে। 

পর্যটন ও বিনিয়োগের মূলধনকে আকৃষ্ট করতে, রপ্তানি বৃদ্ধি, প্রতিভাবান এবং সৃজনশীল কর্মশালাকে আকৃষ্ট এবং বিশ্বের তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে উন্নত করে। জাতি তাদের জাতির ব্র্যান্ড প্রজেক্টের বিভিন্ন উপায় রপ্তানি, বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ, এবং পর্যটনকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি ভাল উদাহরণ হল যে জার্মানি তাদের মোটর

শিল্পের জন্য পরিচিত কারণ কার্সার, অডি এবং বিএমডাব্লিউ 'র মত বিখ্যাত গাড়ী সংস্থা জার্মান কোম্পানি। মার্কিন কোম্পানিগুলি বিভিন্ন দেশে সরাসরি বিনিয়োগ ও একটি ভাল উদাহরণ যা জাতীয় ব্র্যান্ডকে সহায়তা করে।

জাতিসংঘ, কানাডা, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য (যেখানে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জন কূটনীতি হিসাবে পরিচিত ),  মালয়েশিয়া, জাপান, চীন,তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ জাতিসংঘের ব্র্যান্ডিং অনুশীলন করা হয়। এছাড়াও নিউজিল্যান্ড, ইজরায়েল এবং বেশিরভাগ পশ্চিমা ইউরোপীয় দেশের উদারন দেয়া যেতে পারে। 

রাজনৈতিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান,মানবতা, যোগাযোগ, বিপণন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র হিসাবে শিক্ষাবিদদের মধ্যে একটি জাতীয় ব্র্যান্ডিং টীম করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে  আরো উল্লেখ্য করেন যে, -" ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় ওআইসি’র পর্যটন মন্ত্রীদের ১০ম সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় ঢাকাকে ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ৪ ওআইসিভূক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শীর্ষস্থান দখল করে ঢাকা। সম্মেলনে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আজারবাইজানের ’গাবালা’কে ২০২০ সালের সিটি অব ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ঢাকাকে সিটি অব টুরি‌্যজম ঘোষণাকে উদযাপনের জন্য আজ এবং আগামীকাল বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুসলিম নিদর্শনগুলো পরিদর্শন, কনসার্ট এবং হাতির ঝিলে লেজার শো এবং আতশবাজীর প্রদর্শন করা হবে।

ওআইসি’র ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মুসলিম ট্যুরিস্টের সংখ্যা ১৫৬ মিলিয়ন যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ১৮০ মিলিয়ন। একই বছর সারা বিশ্বের জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ হবে মুসলিম।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ‘ইসলামী অর্থনীতি’ সম্পর্কে বলেন, ‘এটি বর্তমানে নবরূপে বিকাশ লাভ করছে। হালাল ফুডস, ইসলামী ফাইন্যান্স, হালাল ফার্মাসিউটিক্যালস এবং প্রসাধনী, হালাল পর্যটন ইত্যাদি হচ্ছে ইসলামিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান খাত।’

‘এ খাতগুলো বিকাশের জন্য ওআইসি সদস্যভূক্ত রাষ্ট্রসমূহের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব একান্ত প্রয়োজন’ (বাসস)।

দ্রুত বর্ধনশীল এ খাতের উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার সাথে সাথে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড নাম এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটনকে একটি শক্তিশালী খাত হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হলে "বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ" বিশ্ববাসীর কাছে  একটি অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কানাডা ইউনিট কমান্ড নির্বাহী ও ডাইভার্স এডমন্টন সম্পাদক 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ