ওদের স্পিনারদের খেলা কঠিন হবে না, বটে!

September 6, 2019, 1:46 PM, Hits: 99

ওদের স্পিনারদের খেলা কঠিন হবে না, বটে!

হ-বাংলা নিউজ : ‘পারস্পরিক স্পিন সামলানোর ক্ষেত্রে যে বাড়ির কাজ, যে পরিকল্পনা ও অনুশীলন, তাতে আফগানিস্তান দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে অনেক এগিয়ে।’ কথাটি কার, তা পরেও বলা যাবে। তবে চট্টগ্রাম টেস্ট দেখে সাধারণ দর্শকমাত্রই একমত হবেন, এ নিরেট সত্য।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে মনে হতেই পারে, টেস্ট দেখা কত কষ্ট? শুধু দর্শক ও সমর্থকদের জন্য নয়, লড়াই করতে হচ্ছে ব্যাটসম্যানদেরও। অথচ কাল প্রথম দিন শেষে স্পিনার তাইজুল ইসলামের ভাষ্য ছিল, ‘আজ উইকেটের যে আচরণ দেখলাম, ওদের স্পিনারদের খেলা কঠিন হবে না! যদি টি-টোয়েন্টি হতো, তাহলে হয়তো ওদের ভালো নম্বর দিতাম। খেলাটা টেস্ট, ওদের বোলারদের ধৈর্য কেমন থাকবে এটাও দেখার বিষয়। আমি আমার দলকে এখনো এগিয়ে রাখব।’

সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস জোগানো অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে কালকের উইকেট বিচারে আজ আরও বাঁক থাকবে, তারতম্য হবে বাউন্সে—এ তো জানা কথা। তাই টিকে থাকতে ধৈর্য দেখানো ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু এ পথে নয়, কিছুক্ষণ ঠুকঠুক করে দু-একটা গুগলি সামলে সেই ধৈর্যচ্যুতিই ঘটেছে। অথচ ধৈর্য দেখানোর কথা ছিল ব্যাটসম্যানদের। ধৈর্যচ্যুতি ঘটার কথা আফগান বোলারদের। কিন্তু ব্যাটসম্যানেরা কি আফগানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারলেন?

জবাবটা লেখা রয়েছে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের স্কোরকার্ডে। আর আজকের খেলা দেখে থাকলে যে কেউ মেনে নেবেন, এ জবাব ‘লেখা’র শুরুটা হয়েছে সাদমান ইসলামকে দিয়ে। টেস্ট ক্রিকেট ধৈর্যের খেলা আর তার ভিত্তি গড়তে হয় ইনিংসের শুরু থেকেই। টেকনিক্যালি ভালো ওপেনার থাকলে এ কাজ আরামের সঙ্গে করা যায়। সাদমান ইসলামকে যেহেতু শুরু থেকেই ‘টেস্ট বিশেষজ্ঞ’ তকমা দেওয়া হয়েছে, তাই অমন একটা ইনিংস খেলার চেষ্টাটুকু অন্তত করতে পারতেন তিনি। সে কাজে প্রথম ‘গুরুদায়িত্ব’ হলো বাইরের বল ছেড়ে খেলা। অথচ সাদমান তা ভুলে গেছেন ইনিংসের চতুর্থ বলেই!

আফগানিস্তানের হয়ে বোলিংয়ের শুরুটা করেছিলেন পেসার ইয়ামিন আহমদজাই। রসিকতা করে কেউ কেউ বলতে পারেন, এ টেস্টে পেসার না নিষিদ্ধ! টেস্ট শুরু হওয়ার আগেই উইকেট নিয়ে নানা আলোচনা আর দুই দল মিলিয়ে দুই অঙ্ক ছাড়ানো স্পিনার দেখে তেমনটাই মনে হতে পারে। ইয়ামিনের নিখুঁত লেংথের ডেলিভারিটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনে করিয়েছে বাংলাদেশ দলে অন্তত একজন পেসার হয়তো রাখা যেত। ইনিংসের শুরুতে যেকোনো ব্যাটসম্যান তা ছাড়বেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাদমান অস্বাভাবিক কাজটিই করলেন। খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। টেস্টের প্রথাগত আউট। তবে ব্যাটিংটা প্রথাগত ছিল না।

জানাই ছিল, এই এক পেসার ছাড়া বাকিরা প্যাঁচ কষবেন। মানে অফ স্পিনার নবী এবং লেগ স্পিনার রশিদ খান আছেন। আরও আছেন এক ‘চায়নাম্যান’ জহির খান ও আরেক লেগি কায়েস আহমেদ। স্পিন-বৈচিত্র্যে ভরপুর এক দল। এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ আক্রমণভাগের বিপক্ষে খেলার কৌশলটা কিছুক্ষণ দেখিয়েছেন সৌম্য সরকার ও লিটন দাস। ১১৪ বলের জুটিতে তুলেছিলেন ৩৮ রান। পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান এ সময় দেখিয়েছেন ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠা উইকেটে কীভাবে স্পিন খেলতে হয়। কিন্তু তারপর? যে লাউ সেই কদু!

না, তেড়েফুঁড়ে মারতে গিয়ে আউট হননি। তবে আউটের ধরন ৬৬ বলের ধৈর্যের প্রতি মোটেও সুবিচার করেনি। ওই ডেলিভারির আগে আরও বেশ কয়েকটি বল ভেতরে ঢুকিয়েছেন অফ স্পিনার মোহাম্মদ নবী। অর্থাৎ বল ভেতরে ঢুকতে পারে, সৌম্য তা জানতেন। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে বলটি খেলেছেন আড়াআড়ি পায়ে। ব্যাটেও লাগাতে পারেননি। স্পিনের লাইন-লেংথ বোঝার আগেই বড় পা নিয়ে খেলার মাশুল গুনেছেন এ ওপেনার। এখানে নবীর ধৈর্যের প্রশংসা করতেই হয়। অভিজ্ঞ এ অলরাউন্ডার আসলে সৌম্যকে খেলিয়ে খেলিয়ে বড়শির ছিপে গাঁথা মাছের মতো তুলেছেন।

আর লিটন নিজেই গেঁথেছেন। দুজনের ইনিংসই ৬৬ বলের। এত বল খেলে ফেলার পর বল আরও বেশি ভালো দেখার কথা। কিন্তু লিটন কী দেখলেন! পুল খেলার প্রতি তাঁর ঝোঁকটা বেশ পুরোনো। লিটন এ ঝোঁকের বশেই নিজের ধৈর্যটুকু বিসর্জন দিয়েছেন। রশিদ খান বল ফেলার সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় আগেই লিটন পুল খেলার পজিশনে! ভেতরে ঢুকে আসা যে বলটা তাঁর সামনের পায়ে খেলার কথা ছিল, শুধু ওই পজিশনের কারণে হতে হলো বোল্ড। এখানেও কিন্তু সেই ধৈর্যের প্রশ্নই ওঠে।

আজ সারা দিনে আফগান স্পিনাররা একটি কাজে দারুণ ধৈর্য দেখিয়েছেন। লেগ স্পিনাররা গুগলির ফাঁদ পেতেছেন বুঝেশুনে। নবীও আর্মার ছেড়েছেন স্টক ডেলিভারির ফাঁকে ফাঁকে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, মাহমুদউল্লাহ উইকেটে আসার পর এক প্রান্ত থেকে টানা বল করেছেন রশিদ। এ সময় গুগলিও ছেড়েছেন তুলনামূলক বেশি। লেগিদের হাত পড়তে মাহমুদউল্লাহর সমস্যা নতুন কিছু না। আজও রশিদের দু-একটি গুগলি ছাড়তে গিয়ে প্রায় বিপদ ঘটিয়ে ফেলেছিলেন আরকি। ধৈর্যচ্যুতি ঘটায় দু-একবার ডাউন দ্য উইকেটেও এসেছিলেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত সেই গুগলিতেই বোল্ড।

মাহমুদউল্লাহর আর কী দোষ? আফগান বোলাররা তাঁকে পড়ে নিয়েই ধৈর্য ধরে জায়গামতো বল করে গেছেন। মাহমুদউল্লাহ স্রেফ তার শিকার! আর মুমিনুল যেন শিকার হয়েই থাকতে চাইলেন না! প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৭১) বল খেলা ব্যাটসম্যানটির ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে সবচেয়ে দৃষ্টিকটুভাবে। পায়ের কাছে পেলে স্পিনারদের তুলে মারার প্রবণতা আছে মুমিনুলের। নবীর বলটিও তুলে মারতে গিয়েছিলেন, কিন্তু লেংথ ভুলভাবে যাচাই করায় তা মিড অনের ফিল্ডার পার হয়নি। নবী এমন কিছু ডেলিভারি খেলিয়ে মুমিনুলকে প্রলুব্ধ করার ফলটা পেয়েছেন হাতেনাতে।

অথচ যাঁর কথা ধরে ব্যাটসম্যানদের এত নিন্দা করা হচ্ছে সেই তাইজুলে দ্বিতীয় দিন পার করতে পেরেছে বাংলাদেশ। দশে নামা কেউ এই উইকেটে ৫৫ বল খেলে অপরাজিত থাকবে, তা কি চাট্টিখানি কথা! বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে এখন পর্যন্ত তাইজুলের স্ট্রাইক রেটই সবচেয়ে কম (২৫.৪৫)। সাকিবরা গিয়ে তাই তাইজুলকে ধরতে পারেন, ওদের ধৈর্য কম বলে আমাদের সর্বনাশ করে নিজে ধৈর্যের অবতার সাজলে!

এ লেখা শুরুতে বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় কোচ ও ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব জালাল আহমেদ চৌধুরীর ফেসবুকে করা মন্তব্য দিয়ে জবাব দিতে পারেন তাইজুল। স্পিন মোকাবিলায় আমাদের ব্যাটসম্যানদের তুলনায় ওদের ব্যাটসম্যানেরাই তো এগিয়ে! ওদের ধৈর্য যত কমই হোক না কেন, আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে আরও দ্রুত——সেটি কী ব্যাটিং কী বোলিং! 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ