তাজিয়া মিছিলে মাতম

September 10, 2019, 1:32 PM, Hits: 240

তাজিয়া মিছিলে মাতম

হ-বাংলা নিউজ : পুরান ঢাকার বাসিন্দা সৌরভ। বয়স ২০। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই রাজধানীর লালবাগের হোসেনি দালানে এসে হাজির। খালি পা, কোনো স্যান্ডেল নেই । গায়ে কালো রঙের পাঞ্জাবি। বুকের মাঝখানে ডান হাত রাখা। মাথা নিচু করে কেবলই বলছেন, ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন।’

শুধু সৌরভ নন, পুরান ঢাকার ধর্মপ্রাণ হাজারো মুসলমান আজ মঙ্গলবার সূর্য ওঠার আগে হোসেনি দালানে হাজির হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী নারী-পুরুষ আসেন সেখানে। তাঁদের পরনে কালো কাপড়, মাথায় বাঁধা কালো পতাকা। আর তরুণদের হাতে কালো পতাকা।

আজ ১০ মহররম। সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ একটি দিন আজ। দিনটি পবিত্র আশুরা নামে পরিচিত। হিজরি ৬১ সনের এই দিনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে শহীদ হন।

শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কারবালার শোকাবহ ঘটনা অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা জোগায়। ১০ মহররমে অনেক ফজিলতময় ঘটনা ঘটেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল রোজা, নামাজ, জিকির-আসকারের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন। আশুরা উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। পুরান ঢাকার হোসেনি দালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আজ শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে তাজিয়া মিছিল বের হয়।

পুরান ঢাকার চকবাজারের বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন। বয়স ৪০। তিনি যখন থেকে বুঝতে শিখেছেন, তখন থেকেই হোসেনি দালান থেকে আশুরার শোক মিছিলে অংশ নিয়ে আসছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট্ট দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ভোরে তিনি হাজির হন হোসেনি দালানে।

শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিহত হন। আজ আমাদের শোকের দিন, দুঃখের দিন, মাতমের দিন।’ এই কথা বলে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন শাহাবুদ্দিন।

সকাল ১০টায় হোসেনি দালান থেকে শুরু হয় আশুরার শোক মিছিল। মিছিলের একজন হয়ে শাহাবুদ্দিন তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে হাঁটা শুরু করেন। মিছিলের সামনে-পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক উপস্থিতি।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হোসেনি দালানের ইমামবাড়ায় হাজির হয়ে জানিয়েছিলেন, আশুরায় তাজিয়া মিছিলে আগুন, তরবারি ও ছোরা ব্যবহার করা যাবে না। আজকের শোক মিছিলে অংশগ্রহণকারী লোকজনের হাতে এসব দেখা যায়নি।

আকরামের বয়স ১৫ বছর। এই তরুণ তাঁর মা–বাবার সঙ্গে থাকেন পুরান ঢাকার উর্দু রোডে। যখন সে ছোট্ট ছিল, তখন বাবার কাঁধে চড়ে এই শোক মিছিলে অংশ নিত। একটু বড় হয়ে একা একাই এই শোক মিছিলে অংশ নেন তিনি। আকরাম বলেন, ‘এই দিনটি শোকের দিন। খুব খারাপ লাগে।’

শোক মিছিলে অংশ নেওয়া সব নারী-পুরুষের অনুভূতিই আকরামের মতো। সবাই শোকে আচ্ছন্ন।

আজকের মিছিলে যেসব তরুণ অংশ নিয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবার হাতেই কালো কাপড় দিয়ে মোড়া বাঁশের লাঠি। লাঠির অগ্রভাবে তরবারিসহ নানা প্রতীক। মিছিলের মধ্যভাগে কয়েকজনের হাতে দেখা গেল রশি। রশিতে বাঁধা সাদা রঙের দুটি ঘোড়া। একটি ঘোড়ার শরীর লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা। আরেকটি ঘোড়ার শরীর সাদা রঙের কাপড় ঢাকা। সাদা কাপড়ের মাঝে রক্তের প্রতীকী দাগ।

মিছিলে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষ ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ মাতম তুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

মিছিলে ছিলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা আবদুর রব। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তাঁর মাথায় বাঁধা কালো কাপড়। গায়ে কালো পাঞ্জাবি। মিছিলের মাঝভাগে থাকা শোকার্ত আবদুর রব বলেন, এই শোক মিছিলে তাঁর পূর্বপুরুষেরা করেছেন। তিনিও করছেন। তাঁর উত্তরসূরিরাও করছে। শোক মিছিলে অংশ নেওয়ার অনুভূতি অন্য কাউকে বোঝানো যাবে না।

প্রায় চার বছর আগে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে হোসেনি দালানে জেএমবির জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এতে একজন নিহত হয়। আহত হয় অনেকে। এই হামলার ঘটনায় হওয়া মামলার বিচারকাজ ঢাকার আদালতে চলছে।

হোসেনি দালান থেকে বের হওয়া এই তাজিয়া মিছিলের আয়োজক হোসেনি দালান ইমামবাড়া ব্যবস্থাপনা কমিটি। ইমামবাড়ার তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ আহমেদ বলেন, চার বছর আগে হওয়া জঙ্গি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তাঁরা।

হোসেনি দালান থেকে শুরু হওয়া আজকের তাজিয়া মিছিলটি আজিমপুর, নিউমার্কেট হয়ে ধানমন্ডির দুই নম্বর সড়কে গিয়ে শেষ হয়।

মিছিলে এক নারী এক শিশুকে কোলে নিয়ে অংশ নেন। শিশুটির বয়স কয়েক মাস। ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ মাতম তুলে এই নারীও মিশে গেলেন শোকের মিছিলে।

হোসেনি দালান থেকে শুরু শুরু হওয়া এই শোক মিছিল দেখতে রাস্তার দুই ধারে জড়ো হয় বহু মানুষ। মিছিলের শোক অন্যের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ