রাতের ঢাকায় মিজানুরের মতো ‘একই কায়দায়’ আরও তিনজনকে হত্যা করে তারা

January 26, 2020, 12:01 PM, Hits: 207

রাতের ঢাকায় মিজানুরের মতো ‘একই কায়দায়’ আরও তিনজনকে হত্যা করে তারা

হ-বাংলা নিউজ : সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা বেসরকারি এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমানকে খুন করে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মিজানকে খুন করা হয় বিমানবন্দর সড়কের ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। খুনিরা লাশ ফেলে রেখে যায় হাতিরঝিলের উড়ালসড়কের ওপর।

মিজানুর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিনজন আসামি ঢাকার আদালতে গত শুক্রবার এবং আজ রোববার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিন আসামি হলেন নুরুল ইসলাম, আবদুল্লাহ বাবু ও মো. জালাল।

২০ দিন আগে (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে (রাত ২টা) এক যুবকের লাশ পড়ে ছিল কারওয়ান বাজার রেলক্রসিং বরাবর উড়ালসড়কের ওপর। হাতিরঝিল থানার পুলিশ ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখে। পরে যুবকের পরিচয় উদ্ধার হয়। নিহত যুবকের নাম মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকার এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি চাকরি করেন বনানীর গোল্ডেন টিউলিপ ফোর স্টার হোটেলে। পদ সিনিয়র ওয়েটার। মিজানুরের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের সবিলপুর গ্রামে।

এ ঘটনায় মিজানুরের ছোট ভাই আরিফ হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুরকে যারা খুন করেছে, তারা ভয়ংকর সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। তিন আসামি আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন, মিজানুর রহমানকে খুন করার আগে তাঁরা আরও তিনটি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। খুন তিনটি সংগঠিত হয়েছে রাজধানীর ভাটারা ও খিলক্ষেত এলাকায়। সেই তিনটি খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়নি।

যেভাবে মিজানুরকে হত্যা

মিজানুরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, লেখাপড়ার পাশাপাশি মিজানুর বনানীর হোটেল ওয়েটার হিসেবে চাকরি করে আসছিলেন। তাঁর বাবা আমির হোসেন গ্রামের বাড়িতে দোকানদারি করতেন। চাকরি করে মিজানুর নিজের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশপাশি বাড়িতে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতেন। থাকতেন শেওড়া এলাকার একটি মেসে।

মিজানুরের ভাই মামলার বাদী আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই মিজানকে যাঁরা খুন করেন, তাঁরা মুঠোফোন নিয়ে গিয়েছিলেন, রেখে গিয়েছিলেন তাঁর মানিব্যাগ। সেই মানিব্যাগে ছিল ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও হোটেলের পরিচয়পত্র। পরে পুলিশ তাঁদের লক্ষ্মীপুর থানায় ফোন দেয়। এরপর ইউনিয়নের এক চৌকিদারের মাধ্যমে ভাই মিজানুরের মৃত্যু সংবাদ পান। ঢাকায় এসে তিনি তাঁর ভাইয়ের লাশের পরিচয় নিশ্চিত করেন।

হাতিরঝিল থানার ওসি এবং তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খায়রুল আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মিজানুর খুন হওয়ার সম্ভাব্য সব কটি কারণ সামনে রেখে তাঁরা অনুসন্ধান শুরু করেন। তবে মিজানুরের মুঠোফোন খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। সেই সূত্র ধরে নুরুল ইসলাম নামের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় মিজানুরের মোবাইল ফোন সংগ্রহকারী আবদুল্লাহ ও জালালকে।

মিজানের ভাই আরিফ জানান, তাঁর ভাই আরিফ সেদিন বনানীর হোটেলে কাজে যোগ দেন বেলা ২টায়। রাত ১১টার সময় কাজ শেষে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন।

পুলিশ কর্মকর্তা খায়রুল বলেন, হোটেল থেকে কাজ শেষে নিজের বাসায় (শেওড়ায়) যাওয়ার জন্য বনানীর কাকলীতে অপেক্ষা করতে থাকেন। গভীর রাতে যানবাহন কমে যায়। তখন সিএনজিচালিত একটা অটোরিকশা সেখানে আসে। অটোরিকশার ভেতর দুজন যাত্রী বসা ছিল। তারা বলেছিল, অটোরিকশা যাবে বিমানবন্দরে। তখন মিজান ওই অটোরিকশায় ওঠেন। চালক ছিলেন ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য নুরুল ইসলাম। অটোরিকশাটি যখন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে আসে, তখন যাত্রীবেশী ছিনতাইকারী চক্রের দুই সদস্যের (নাজমুল ও শাহীন) একজন মিজানকে বলেন, বমি আসছে। মিজান যেন তাঁদের মাঝখানে বসেন। মিজান তখন মাঝখানে বসেন। নাজমুল ও শাহীন তখন মিজানকে বলেন, যা আছে তা যেন দিয়ে দেন। কিন্তু মিজান দুই ছিনতাইকারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেন। একপর্যায়ে দুই ছিনতাইকারী নাজমুল ও শাহীন মিজানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। মিজান হত্যায় গ্রেপ্তার তিন আসামি তাঁদের কাছে এবং আদালতের কাছে এসব কথা স্বীকার করেছেন।

হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশীদ বলেন, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের এই সদস্যরা মিজানকে খুন করার আগে আরও তিনটি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা যাত্রী সেজে অটোরিকশায় থাকে। নিরীহ লোকদের ওই অটোরিকশায় ওঠানোর পর তাদের মালামাল লুট করে নেয়। বাধা দিলে তাদের কাছে থাকা গামছা কিংবা মাফলার দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে।

হাতিরঝিল থানার ওসি জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমান হত্যায় জড়িতে সংঘবদ্ধ ভয়ংকর ছিনতাইকারী চক্রের অপর সব সদস্যকে শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে।

মিজানের ভাই আরিফ বলেন, সামনের মাসে তাঁর ভাইয়ের জাপানে যাওয়ার কথা ছিল। তাঁর ভাই পাসপোর্টও রেডি করেছিলেন। কে বা কারা তাঁর ভাইকে খুন করেছে, সে তথ্য তাঁরা এখনো জানেন না। তবে যে বা যারা তাঁর নিরীহ ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের ফাঁসি চান।

আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার মা পাগলের মতো হয়ে গেছেন। ভাইকে তো আমরা ফিরে পাব না। আমরা খুনিদের ফাঁসি চাই।’ 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ