চীনের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের হানা, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার আশঙ্কা

February 3, 2020, 1:13 PM, Hits: 312

 চীনের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের হানা, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার আশঙ্কা

হ-বাংলা নিউজ : ২০১৯-এনসিওভি। এই নামেই পুরো বিশ্বে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নতুন করোনাভাইরাস। এই রোগের শুরু চীনে, এখন ছড়িয়ে গেছে বেশ কয়েকটি দেশে। মৃত্যুর সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও। শুধু মানুষের জীবন নয়, এখন চীনের অর্থনীতির জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাস। আর চীন যখন হুমকিতে, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতিও নিরাপদে থাকতে পারছে না।

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানকে এই করোনাভাইরাসের আঁতুড়ঘর হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে প্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে। চীনের বাইরে ২৫টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এর মধ্যে চীনের বাইরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম একজনের মৃত্যু হয়েছে ফিলিপাইনে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাসের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে করোনাভাইরাস। এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যায় সার্সকে ছাড়িয়ে গেছে এটি।

চীনের উহান এখন কার্যত একটি অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ উড়োজাহাজ পাঠিয়ে উহানে থাকা নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে উহান শহর ও হুবেই প্রদেশে নেওয়া হয়েছে কঠোর প্রতিরোধব্যবস্থা। সাধারণত কোনো মহামারি রোগের সংক্রমণ ঠেকাতে শুরুতেই এ কাজ করা হয়। তবে নিন্দুকেরা বলছেন, চীন এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি করে ফেলেছে। আর এ কারণেই দেশে দেশে করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়নি। ডিসেম্বর থেকে প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও চীনের সরকার এ বিষয়ে কিছুটা রাখঢাক করতে চেয়েছিল। এই ভাইরাস–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য (যেমন: জিনোম সিকোয়েন্স) বিশ্বকে জানাতেও দেরি করেছে সি চিন পিংয়ের সরকার। এই সময়ের মধ্যে উহান বা হুবেই থেকে আক্রান্ত মানুষেরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি উহানকে কোয়ারেন্টাইন করার ঘোষণা দেওয়ার পর তা কার্যকর করা নিয়েও বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, উহানকে কোয়ারেন্টাইন করার ঘোষণার প্রায় ৮ ঘণ্টা পর তা কার্যকর করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ উহান ছেড়ে যায়, যাদের অনেকেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিল।

করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যদিও প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে, তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, তৈরি করা গেলেও সময় লাগবে প্রায় ৬ থেকে ১২ মাস। স্বাভাবিকভাবেই এই সময়টায় উহান, হুবেই তথা পুরো চীন পৃথিবীর জন্য ভয়ের কারণ হিসেবে রয়ে যাবে। আর এই ভীতি একদিকে যেমন চীনের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তেমনি অন্যদিকে শ্লথ করে দেবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চাকা।

চীনের অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে?

করোনাভাইরাসের আর্থিক আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীনের হুবেই প্রদেশ। পুরো প্রদেশের প্রায় ৬ কোটি মানুষ এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। খাদ্যবাহী ট্রাক ও চিকিৎসাসামগ্রী ছাড়া আর কিছুই এখন ওই এলাকায় ঢুকতে পারছে না। অঞ্চলটির বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে চালু আছে কেবল হাসপাতাল সেবা ও ভিডিওস্ট্রিমিং। বাকি সব আর্থিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ চীনের জিডিপির সাড়ে ৪ শতাংশ আসে হুবেই থেকে। ফলে হুবেই স্থবির থাকার অর্থ হলো চীনের সার্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। অথচ করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের আগে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশ।

ওদিকে উহান এলাকাটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অটোমোবাইল বা গাড়ি নির্মাণশিল্প। নিসান, হোন্ডা ও জেনারেল মোটরসের কারখানা আছে উহানে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় এসব কারখানা বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অংশ হিসেবে উহানে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে।

করোনাভাইরাস এমন সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন চীনে চলে এসেছে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার সময়। নতুন রোগের কারণে এই উৎসব ঘিরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর এই সময়টায় চীনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার তাতে ধস নামতে পারে। আবার নতুন বছরের এই ছুটির সময়টাতেই চীনের সিনেমাশিল্প সবচেয়ে বেশি আয় করে থাকে। পুরো বছরের মোট আয়ের ৯ শতাংশ গত বছরের এই সময়টায় আয় করেছিল চীনের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু এবার একই সময়ে চীনের প্রায় ১১ হাজার সিনেমা হল করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কমে গেছে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের পরিমাণও। করোনাভাইরাসের কারণে চীনের অনেক নাগরিকই দেশের ভেতরে ঘোরাঘুরি বাতিল করে দিচ্ছে।

শুধু হুবেই নয়, সাংহাই ও গুয়াংডং-এর মতো অন্যান্য প্রদেশেও করোনাভাইরাসের আতঙ্ক ভর করেছে। নতুন বছর উপলক্ষে ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানিকে কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স বলছে, এভাবে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কারখানা বন্ধ থাকায় চীনের প্রবৃদ্ধির হার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এদিকে স্টারবাকস পুরো চীনে ছড়িয়ে থাকা তাদের ৪ হাজার ২৯২টি ক্যাফের প্রায় অর্ধেক বন্ধ করে দিয়েছে। সাংহাইতে নিজেদের রিসোর্ট বন্ধ করে দিয়েছে ডিজনি। নতুন বছরের সপ্তাহব্যাপী ছুটির পর চীনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের চাকায় গতি আসতে এমনিতেই বেশ সময় লাগে। এবার তা আরও কঠিন হয়ে যাবে। টেকজায়ান্ট টেনসেন্টের মতো কিছু কোম্পানি তাই এখন কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছে!

বৈশ্বিক অর্থনীতির কী হবে? 

২০০৩ সালে পৃথিবীতে আতঙ্ক তৈরি করেছিল সার্স। চীন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল সার্স। ওই রোগে ৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সেই সময়ে বৈশ্বিক জিডিপির ৪ শতাংশ আসত চীন থেকে। আর গত বছর বৈশ্বিক জিডিপিতে চীনের অবদান ছিল ১৬ শতাংশ। সুতরাং সার্সের তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব হবে আরও বিধ্বংসী।

যেহেতু চীনের প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক জিডিপিতেও এর প্রভাব পড়বে। কারণ, বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক-পঞ্চমাংশ আসে চীন থেকে। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে যাওয়া পর্যটকের পরিমাণ মারাত্মক কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ চীন বর্তমানে বিশ্বে পর্যটনের অন্যতম বৃহৎ স্থান। একই সঙ্গে বিপদে পড়বে বিভিন্ন এয়ারলাইন কোম্পানিও। কারণ, তাদের দেখা দিতে পারে যাত্রীর আকাল।

ওদিকে চীনের কারখানাগুলো বন্ধ থাকার অর্থ হচ্ছে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এলোমেলো হয়ে যাওয়া। বর্তমানে বৈশ্বিক ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত প্রায় ৮০ শতাংশ উপাদান যায় চীন থেকে। পৃথিবীতে তৈরি প্লাস্টিকের তৈরি ফুলের ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে সি চিন পিংয়ের দেশ। আবার ফক্সকনের মতে, চীনা কোম্পানিই তৈরি করে অ্যাপলের বিখ্যাত আইফোন। ফলে সব ক্ষেত্রেই টানাপোড়েন তৈরির শঙ্কা তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে ফক্সকনের শেয়ারের দাম কমে গেছে ১০ শতাংশ হারে। আর নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে দরপতন হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় চিকিৎসা খাতে। সুতরাং এই খাতেও চীনসহ বিভিন্ন দেশের ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

এসব বিবেচনায় নিয়ে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সত্যি হলে এটিই হবে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বনিম্ন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকেই অনেক পশ্চিমা কোম্পানি চীনের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই কাজে খুব একটা সফলতা আসেনি। করোনাভাইরাসের কারণে এবার বড় বড় বিনিয়োগকারীরা আবার সেই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চীন ও বিশ্বের অর্থনীতি যে ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সার্স মহামারির অভিজ্ঞতা আমলে নিলে বলতে হয়, এ ধরনের সংকট কাটিয়ে ওঠার পর পরই চীনা অর্থনীতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

কিন্তু এই আশাবাদ মূলত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো ও তা কার্যকর প্রতিরোধের ওপর নির্ভরশীল। সেই কাজ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সেটিই এখন দেখার। করোনাভাইরাসের দাপট যত দিন চলবে, তত দিন তাই অর্থনীতির চাকাও বেশ মন্থরগতিতে চলবে। 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ