চলচ্চিত্র মিডিয়ায় স্তর ভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কার ?

May 23, 2020, 11:39 AM, Hits: 231

চলচ্চিত্র মিডিয়ায় স্তর ভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কার ?

হ-বাংলা নিউজ : বিশ্বব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্যের সার্থক সমন্বয়ের সর্ববৃহৎ ও সংবেদনশীল গণমাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। তাই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে গভীরভাবে জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে বাংলা চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মিডিয়ার বয়স প্রায় ৭০ বছর। অধিকও হতে পারে। পাকিস্তান আমলে উর্দু ভাষায় এখানে চলচ্চিত্র নির্মিত হতো। সে সময় অল্পকিছু বাংলা ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রও মুক্তি পেয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতা অর্জনের বয়স ৫০ বছর হতে চলেছে। এতো বছরের পুরনো বাংলা চলচ্চিত্র মিডিয়া, অথচ এখনো এখানে পরিচালক/নির্মাতার স্তর ভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পায় নি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পরিচালক/নির্মাতার স্তর ভিত্তিক মর্যাদা বলতে কি বোঝাই, সেটাও অনেকের কাছে পরিস্কার নয়।

বিষয়টি সহজবোধ্য করে তুলে ধরার স্বার্থে আমাদের আলোচনা ‘পরিচালক/নির্মাতা কি?’ ও ‘পরিচালক/নির্মাতার স্তরভিত্তিক মর্যাদা কি?’ এ দু’ভাগে বিভক্ত করা হলো।


পরিচালক/নির্মাতা কি?:

পরিচালক বা নির্মাতা মূলক একজন শিল্পী। পৃথিবীতে যতো ধরনের শিল্পী রয়েছেন, এঁদের মধ্যে সর্বশীর্ষ পর্যায়ের শিল্পী হলেন নির্মাতা। একজন চিত্রশিল্পী যখন চিত্র অঙ্কন করেন, তখন তিনি যে ক্যানভাস, রঙ, তুলি, স্ট্যান্ড, কয়েকজন সহকারী ও যে বিষয়বস্তুকে কল্পনায় নেন তার সবকিছু হলো চিত্রকর্মটি সৃষ্টির মিডিয়া। এভাবে যা আঁকা হয় সেটাই চিত্রকর্ম, আর যিনি আঁকলেন তিনি চিত্রশিল্পী। ঠিক এমনভাবে বলা যেতে পারে, একজন পরিচালক বা নির্মাতা যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তখন নির্মাণের জন্য যে স্ক্রীপ্ট, অভিনয় শিল্পী, ক্যামেরাম্যান, সঙ্গীত পরিচালক, নত্যৃ পরিচালকসহ অন্যান্য পরিচালকবৃন্দ, ক্যামেরা, লাইটসহ যাবতীয় শ্যুটিং ইক্যুয়ীপমেন্ট, অডিও/ডাবিং স্টুডিও, এডিটিং প্যানেলসহ চলচ্চিত্র নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সব ব্যক্তি ও যাবতীয় যন্ত্রাদি হলো চলচ্চিত্র নির্মাণ বা সৃষ্টির মিডিয়া। এ মিডিয়াগুলোর স্বার্থক সমন্বয়ের মাধ্যমে যা নির্মাণ করা হয় তা হলো চলচ্চিত্র। আর যিনি নির্মাণ করলেন তিনি পরিচালক বা নির্মাতা। ক্যানভাসে আঁকা ছবির শিল্পস্বত্ত্ব যেমন চিত্রশিল্পীর, ঠিক তেমনি চলচ্চিত্রের শিল্পস্বত্ত্বটিও শুধুই পরিচালক বা নির্মাতার। সৃষ্টি করা চিত্রকর্মটিকে যেমন বলা যায়- এটা অমুক চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্ম। এমনভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রটিকে বলা যায়- অমুকের (পরিচালকের নাম) চলচ্চিত্র। চিত্রকর্ম সৃষ্টি ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যয় যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিবে তারা সেটার বাণিজ্যিক স্বত্ত্বের মালিক হবেন, কিন্তু শিল্পস্বত্ত্বের মালিক যথারীতি চিত্রশিল্পী অথবা নির্মাতা হবেন। এ শিল্পকর্মগুলোকে চিত্রশিল্পী বা পরিচালক/নির্মাতা ব্যতিত অন্যকারো নামে প্রচার করা শুধু মুর্খতা নয়, ঘৃণ্য কাজও বটে।

পরিচালক/নির্মাতার স্তরভিত্তিক মর্যাদা কি? 

জনগণের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের জনপ্রতিনিধি বলা হয়। যেমন: জাতীয় সংসদ সদস্য, সিটি বা পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সর্বশীর্ষ পর্যায়ের হলেন জাতীয় সংসদ সদস্য। সিটি মেয়র মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন। তাই সিটি মেয়র ব্যতিত অন্যসব জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় জাতীয় সংসদ সদস্যদের সম্মানী বেশি হবে বা সেটাই কার্যকর রয়েছে। এক্ষেত্রে বয়স, জনপ্রিয়তা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অন্যকোন মানদণ্ড বা যুক্তি দিয়ে কোন সংসদ সদস্যকে অন্য জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে কম সম্মানী দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

আবার, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরীতে চারটি শ্রেণী ভাগ করে দেয়া হয়েছে। ক্যাডার ও নন-ক্যাডার এমন বিভাজনের হিসাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৫ বছরের অভিজ্ঞ নন-ক্যাডার অফিসারের চেয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অনভিজ্ঞ-অল্পবয়সী ক্যাডার অফিসারের বেতন বেশি।

এভাবে, সব সেক্টরে স্তরভিত্তিক মর্যাদা নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে চলচ্চিত্র মিডিয়ায় তা একেবারেই নেই। চলচ্চিত্র মিডিয়ায় সর্বশীর্ষ স্তরের শিল্পী হলেন পরিচালক বা নির্মাতা। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচালক/নির্মাতাদের অর্থাভাবে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়। চলচ্চিত্র মিডিয়ার জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কি হতে পারে? প্রায় ৭০ বছরের পুরনো চলচ্চিত্র মিডিয়ার দূরাবস্থার এ করুণচিত্র মাত্র ক’বছর মিডিয়ায় বিচরণকারী নির্মাতা প্রাচ্য পলাশকে ২০২০ সালে বলতে হচ্ছে। ভাবতে ভীষণ অবাকই লাগছে।

যাঁরা বাংলা চলচ্চিত্রকে ভালবাসেন, বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়ন চান, তাদের সবার এখন অন্যতম চাওয়া হওয়া উচিত পরিচালক/নির্মাতার স্তরভিত্তিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো- একটি শ্যুটিং ইউনিটে যেটা সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক/সম্মানী, ওই শ্যুটিং ইউনিটের নির্মাতার সম্মানী ১৫% অধিক যোগ করে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ যদি কোন অভিনয় শিল্পী, ক্যামেরাম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট বা অন্য যে কারো পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয় ১ কোটি টাকা, তবে ওই শ্যুটিংয়ের পরিচালক/নির্মাতার নূন্যতম পারিশ্রমিক হবে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ভাবনার সাথে পরিচালক/নির্মাতাসহ নির্মাণ সংশ্লিষ্ট সবার স্তরভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ভাবনা অবশ্যই যোগ করতে হবে। আমরা যতো দ্রুত সর্বশীর্ষ পর্যায়ের শিল্পী পরিচালক/নির্মাতাসহ নির্মাণ সংশ্লিষ্ট অন্য সবার স্তরভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারবো, ততো দ্রুত চলচ্চিত্রের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে পারবো এবং একটা বড়-সড় কলঙ্ক থেকে বাংলা চলচ্চিত্র মিডিয়াকে মুক্ত করতে পারবো। 

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ