আধুনিক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ

July 11, 2020, 8:00 AM, Hits: 231

আধুনিক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ

ইঞ্জিঃ এ কে এম রেজাউল করিম, হ-বাংলা নিউজ : ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।’ কিংবা সোনালি কাবিন কবিতায়- ‘বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল/গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল।’ আবার ‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে/পাঠে আমার মন বসে না/কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’

এমন অসংখ্য কালজয়ী কবিতা ও শিশুতোষ কবিতার স্রষ্টা, আবহমান বাংলা ও বাঙালি ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদের ৮৫তম জন্মদিন আজ ১১ জুলাই আজ শনিবার। ১৯৩৬ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন বরেণ্য এই কবি।


আল মাহমুদের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘সোনালী কাবিন’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘একচক্ষু হরিণ’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি দূরগামী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উড়ালকাব্য’ ইত্যাদি। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকি’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বেশকিছু গল্পগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। এ ছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ তার আত্মজীবনী গ্রন্থ।

বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী কবি আল মাহমুদের বর্ণমালার পাঠ শুরু হয় দাদি বেগম হাসিনা বানু মীরের কাছে। ভাষা আন্দোলনের সময় নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ব্রা‏হ্মণবাড়ীয়ায় ভাষা আন্দোলন কমিটির লিফলেটে তার কবিতা ছাপা হলে পুলিশ তাকে খুঁজতে থাকে। সে সময় ভাষার মিছিলে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে আল মাহমুদের কবিতা গান হিসেবে গাওয়া হতো। 



লেখালেখি ও স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৫৪ সালে। চাকরি নেন দৈনিক মিল্লাতে। ১৯৫৫ সালে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা ছাপা হলে বাংলা সাহিত্যে সাড়া পড়ে যায়। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলা পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৬৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন প্রুফ রিডার হিসেবে। সে বছর বন্ধুজন কাইয়ুম চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, হাশেম খান, রফিক আজাদের সহায়তায় কপোতাক্ষ থেকে আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তরে’ প্রকাশিত হয়।


আল মাহমুদ তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’ এর ১ নম্বর সনেটটি চট্টগ্রামে বসে লেখেন। ১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।



১৯৭১ সালে তিনি ভারত গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় প্রতিষ্ঠা-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সম্পাদক থাকাকালীন এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাদণ্ড ভোগ করেন।



১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসীদের মুখপত্র এবং সরকারবিরোধী একমাত্র রেডিক্যাল পত্রিকা ‘গণকণ্ঠ’ বের হলে তিনি এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গণকণ্ঠ সেই সময় ব্যাপক হৈ চৈ ফেলে দেয়।



তার লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমীর সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এ সময় তার গল্পগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়।



১৯৮৪ সালে কলকাতা থেকে কবিতার জন্য কাফেলা সাহিত্য পুরস্কার এবং ছোটগল্পের জন্য বাংলাদেশে হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৬ সালে কবিতায় রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক পান।



তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। উপন্যাস বিশটি এবং গল্পগ্রন্থ দশটির মতো। 

সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্য অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আল মাহমুদ। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, কলকাতার ভানু সিংহ সম্মাননা উল্লেখযোগ্য। 


‘স্মৃতির মেঘলাভোরে’ কবিতায় আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ’। কোনো এক শুক্রবার যদি মৃত্যু এসে ‘যাওয়ার তাকিদ’ দেয় তাহলে সেই মৃত্যুকে তিনি ‘ঈদ’ হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করবেন। গত শুক্রবার মৃত্যু এসে নিয়ে গেছে তাঁরে।


১৯৩৬ সালে জন্ম নিয়েছিলেন মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। সেই তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ হিসেবে এই ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর জাগতিক ব্যক্তিসত্তার অবসান কিংবা বলা যায় চূড়ান্ত পরিণতি হলো। সেদিক থেকে তাঁর লৌকিক বয়স দাঁড়াল ৮৩ বছর। কিন্তু গত কয়েক দশকে তাঁর কবিসত্তার যে শৈল্পিক বিস্তার ঘটেছে, তার শিগগির অবসানের শঙ্কা নেই। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যে কালোত্তীর্ণ হয়ে রয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।



পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত কবি আল মাহমুদ কবিতা ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ইত্যাদি।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের প্রথম কবিতার বই `লোক লোকান্তর`। এর তিন বছর পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তার আরও দুটি কবিতার বই `কালের কলস` ও `সোনালী কাবিন`। এর মধ্যে `সোনালী কাবিন` তাকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। এ ছাড়া তার `মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো`, `অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না`, `একচক্ষু হরিণ`, `মিথ্যাবাদী রাখাল` ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ উল্লেখযোগ্য।

`কাবিলের বোন`, `উপমহাদেশ`, `ডাহুকি`, `আগুনের মেয়ে`, `চতুরঙ্গ` ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। `পানকৌড়ির রক্ত`সহ বেশ কিছু গল্পগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। এ ছাড়া `যেভাবে বেড়ে উঠি` তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ।


সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্য অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আল মাহমুদ। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার ও কলকাতার ভানুসিংহ সম্মাননা উল্লেখযোগ্য।



অবুঝ শিশুর চোখ

আল মাহমুদ

নগরের উদ্ভট কবির দলে মিশে গিয়ে আমি

ভাসলাম জেনে নেবো মানুষের নিগূঢ় জীবন

কি ভাবে ফেলেছে ছায়া নাগরিক কবিদের মনে,

নির্জন পাঠের প্রথা ছেড়ে দিয়ে আমিও এদের

সহজ সাঙাত হবো। রেস্তোরাঁয় আড্ডায় আসরে

আনন্দের দীপশিখা প্রাণপণে জ্বালিয়ে কেবল

বুঝবো অমৃত বলে কোন কিছু দাঁড়ায় না কেন-

আমাদের আধুনিক অবিশ্রান্ত শিল্পের জগতে?

অথচ অজ¯্র কথা প্রতিদিন গড়িয়ে পড়েছে

ছড়িয়ে পড়ছে কত অহোরাত্র অক্ষরের নদী,

অন্তর অবধি কত ছুঁয়ে গেছে তরুণ প্রয়াস

কেন তবু অনড় আনন্দ বলে দাঁড়ায় না কিছু?

রেস্তোরাঁর অন্ধকার প্রকোষ্ঠের তলে আমি তাই

গভীর প্রার্থনা নিয়ে কাটিয়েছি কয়েক বছর।

একদিন জানলাম পৃথিবীর ¯েœহের ভা-ার

একদম ফুরিয়েছে বলে, অন্য প্রেমের প্রান্তরে

আমাদের ধীরে ধীরে অগ্রসর, হতে হবে ফের।

আমাদের নারীদের মায়েদের বিবস্ত্র শরীরে

বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যের শোভা খুলে দাও, আচ্ছঅদনে

অবুঝ শিশুর চোখ আজ নাকি মাতৃত্ব বোঝে না।

এদেশ সবুজ কেন, বললেন এক বিটনিক-

এদেশ সবুজ কেন হায়! তারাতো বরফ চান

ধূসর ধারণা চান হেঁটে যেতে চান কোন দূর

অজানায়। চুলে তেল মাখা এক ভয়ানক কাজ

তাই এই কবিদের মস্তিষ্কের ধূসর প্রখর

শিখা জ্বলে চোখ কান নাক আর বুকের ওপর।


কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ রে ১৩৭০ এর শ্রাবণ সংখ্যায়, প্রকাশকাল দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে আল মাহমুদ এই সমকালীনে ‘কালের কলস’ এর কবিতাবলি সৃজনে নিয়োজিত ছিলেন। পুরানো সমকালের সংখ্যা কৌতুহল বশত খুঁজতে খুঁজতে মনি মুক্তার মত কবিতাটি পেয়ে গিয়েছিলাম। এই রকম অনেকবার আমার জীবনে ঘটেছে। আল মাহমুদকে মূলত পঞ্চাশের কবি বলা হলেও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাবলির তালিকা দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এই সময়ে শুধু আল মাহমুদ নয়, আরও কয়েকজন প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব হয়েছিলো- তাঁদের রচনার পাশাপাশি আল মাহমুদ-এর রচনার স্বাতন্ত্র্যময়তা সবেমাত্র পরিস্ফুটিত হতে শুরু করেছ। অবশ্য কাব্যভাষা বলতে যা বোঝায়, কবিতায় এই দশকেই অর্জন করে ফেলেছেন আল মাহমুদ, যা তরুণ কবি হিসেবে আল মাহমুদের প্রতিভাকে সবাই স্বীকার করে নিলেও, প্রতিষ্ঠা কিন্তু খুব সহজে আসেনি, না আসাটাও কবি আল মাহমুদের জন্য মঙ্গলকর হয়েছিল। অবশ্য কবিদের যাত্রাপথ এই রকম হওয়াই স্বাভাবিক, আগেই উল্লেখ করেছি কবিতাটি ‘সমকালে’ প্রকাশিত হয়েছিল। আজ এ পর্যায়ে এসে আমাদের মনে হয়েছে সিকান্দার আবু জাফরের ‘সমকাল’-এ তাঁর উদার হস্ত প্রসারিত না করলে আল মাহমুদ এর মত প্রতিভাবান কবিকে হয়তোবা আমাদের হারাতেই হতো। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এই উদার হস্তের কথা স্মরণ করেই পরবর্তী কালে আল মাহমুদ লিখেছিলেন, “সমকালের আবু জাফর স্মরণে” নামে একটি অসাধারণ কবিতা।



একবার একজন দীর্ঘকায় মানুষ আমার আড্ডার ওপর টোকা মেরে

খুব মৃদু স্বরে ডেকে উঠেছিলেন, সাহস, সাহস জেগে আছে?

আমার নাম সাহস নয়, কেন হবে? তবুও কেন জানি মন্ত্রমুগ্ধের মত

আমি সাড়া দিলাম এইতো আমি আমি জেগে আছি।

(প্রথম প্রকাশ: কাশিনাথ রায় সম্পাদিত- নিরন্তর, ২য় সংখ্যা, ১৯৯১)


পরে আল মাহমুদ তাঁর এই কবিতাটি গ্রন্থিত করেন! আরব্য রজনীর রাজহাস” কাব্যগ্রন্থে। আবার এই সত্যের পাশাপাশি আমাদের আপ্লুত করছে, যখন আমরা সাক্ষ্য পাই ষাট দশকের কবি সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি রচনায়, মান্নান সৈয়দ জানিয়েছেন, “বাংলাদেশের জন্মের পর তখনকার পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘সমকাল’ পুনঃপ্রকাশ সংক্রান্ত একটি সভা ডেকেছিলেন, সেখানে তিনি সমকালের সন্তান হিসেবে তিনজনের উল্লেখ করেন। (ক্রমে তার) আবদুল মান্নান , সাইয়্যিদ আতিকুল্লাহ, আল মাহমুদের।”(দরজার পর দরজা, পৃষ্ঠা-১৫)

যাই হোক এই সমস্ত তথ্যাবলি বহিরাঙ্গীক এর মধ্যে দিয়ে কবির কাব্য সমালোচনা কিংবা গুণাগুণ বিশ্লেষণ কিংবা কবির চরিত্র বোঝা সম্ভবপর হওয়ার কথা নয়। কারণ কবির কবিতাকে বুঝতে হলে কবিতার স্বনির্মিত আইন-কানুন দিয়েই সমালোচনার ঝড় ঝঞ্চা অতিক্রম করতে হবে। অগ্রন্থিত কবিতাটির গঠন কেন্দ্রিকতার দিকে নজর ফেরালেই দেখা যাচ্ছে এই সময় কবি আল মাহমুদ- মাত্রাবৃত্তের পাশাপাশি (মাত্রাবৃত্তের সর্বাধিক ব্যবহার করেছেন ‘লোকলোকন্তর’ কাব্যগ্রন্থে) সনেট কবিতা সৃজনের ক্ষেত্রে সমান মনোযোগ দেখাচ্ছেন, মোটামুটি ভাবে বলা যায় এক সুস্থ স্বচ্ছ আত্মকেন্দ্রিক জগতের অধিকারী এক কবি। 


তবে একথা ঠিত ছন্দের ক্ষেত্রে আল মাহমুদ কোন প্রকার বৈপ্লবিক রীতি বা প্রকরণের অনুকারী নন, আর অত্মকেন্দ্রিকতার সুর মোটামুটি বদলেরিয় ধারায় আবদ্ধ হলেও গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা বারবার ধ্বনিত হয়েছে। যিনি লক্ষ্য করেন দর্পিত হিংস চোখে, তাঁকে রক্ষা করে শহরের কোন এক কুটিল আয়না, শুরু হয় পশু আর শিশুর মধ্যে বিরোধ।


আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থে ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই কবির চেতনায় ঘটে গেল পরিবর্তনের হাওয়া, দেখা গেল কিছু সামাজিক বিষয় আশয় অবলীলাক্রমে প্রবেশ করেছে তাঁর কবিতাতে, যেমন “রবীন্দ্রনাথ” ও “নিদ্রিতা মায়ের নাম” উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আমাদরে প্রশ্ন হলো আল মাহমুদ কেনো এখন অবধি এই কবিতাটিকে গ্রন্থিত করলেন না? আল মাহমুদকে আমি একবার ব্যক্তিগতভাবে বাংলা একাডেমিতে একটি কবিতার ক্লাসের পর জিজ্ঞাসা করলে মনে করতেই পারলেন না এই কবিতাটির কথা। 

আমার প্রত্যাশা ছিল আল মাহমুদ তার ‘কবিতাসমগ্র’তে গ্রন্থিত করবেন, ইতোমধ্যে ২য় খ- প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু খুঁজে পেতে দেখলাম, আল মাহমুদ যে কোন কারণেই হোক আমাদের এই কবিতাটি গ্রন্থন করেননি। তাহলে কি আল মাহমুদ এই দুর্বল কাগুজে সন্তানের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন? আমি আগেই উল্লেখ করেছি, আল মাহমুদ এই পর্ভে ক্রম পরিশীলিত হয়ে কাব্যভাষায় শুধু নয়, ছন্দের ক্ষেত্রেও ক্রমান্বয়ে অতলস্পর্শী দক্ষতাও অর্জন করেছেন। এবং কাব্যভাষা নির্মাণের জন্য অপূর্ব সম্ভাবনার দরজার পর দরজা কছেন উন্মোচিত, কারণ অক্ষর বৃত্ত শুধু নয় গদ্য কবিতার দিকে আগ্রহের দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন। এই সময়ে অক্ষর বৃত্তের ১৮ মাত্রার এক গুচ্ছ কবিতা সৃজন করেছেন, কবিতা সমূচয় থেকে উদাহরণের তালিকা দেয়া যাক, প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই সমস্ত কবিতায় আল মাহমুদ মিল-অমিল এর দুটি ধারাই অনুসরণ করেছেন।

১. আমরা কোথায় যাবো, কতদূর যেতে পারি আর,

এই তো সামনে নদী, ধান ক্ষেত পেছনে পাহাড়

বাতাসে নুনের গন্ধ, পাখির পাপড়ি উড়ে যায়

দক্ষিণে আকাশ জুড়ে সিক্ত সহ¯্র জোড়ায়

-প্রত্যাবর্তন, কালের কলস

২. সাপের দেহের মত অতিকায় পিচ্ছিল সড়ক

পার হতে পারো যদি একবার অশনী সংকেতে

সহসা দেখতে পারে সামনে এক জলের বিস্তার

এইসব সমুদ্র দেখো, যার নাম মরণ পয়োধি।

-পথের বর্ণনা, কালের কলস

আলোচনার সুবিধার্থে কেবলমাত্র দুটি উদাহরণ তুলে ধরলাম। এবার আলোচ্য কবিতার বলয়ে প্রবেশ করা যাক। কবিতাটি পাঠ করলে বোঝার কোন অসুবিধা হচ্ছে না যে কবি আল মাহমুদ কবিতার মূলচেতনার কোন পরিবর্তন হয়নি। তরুণ কবির প্রত্যাশা ছিলো নগরের উদ্ভট কবিদের দলে মিশে গিয়ে নগর জীবনের কিছু গুঢ় জটিল রহস্য জেনে নিবেন, কিন্তু কবি তাদের সাথে মেলামেশার পর বোধগম্য হচ্ছে তেমন কিছু পাওয়া এখান থেকে সম্ভব নয়। কারণ কবি বলছেন, একদিন জানলাম পৃথিবীর ¯েœহের ভা-ার একদম ফুরিয়েছে বলে অন্য প্রেমের প্রান্তরে আমাদের ধীরে অগ্রসর হতে হবে ফের। 


কারণ যে, কবিদের সাথে কয়েকটা বছরের রেস্টুরেন্টের অন্ধকারের প্রকষ্ঠে থেকেছেন তারা এখন সবুজ চান না, বিষয়টা নিঃসন্দেহে জটিল এবং বিশ্লেষণ যোগ্য। এদিক থেকে করলে দেখা যাবে, আল মাহমুদ কোনক্রমেই সুবোধ্য কবি নন, কিছু অপ্রাপ্তির ব্যাখ্যা অবশ্যই দার্শনিক বোধ তাঁর কবিতাতেই থেকে যায়, বোঝাটা মূলত নির্ভর করে পাঠকের বোধগম্যতার উপর। তার মানে এই নয় যে, আল মাহমুদ আধুনিক জগতের জটিলতার উত্তরাধিকারীর সন্তান। তাঁর ভাষা সব সময় বলে গেছে “পারিপাশ্বিক কম্পমান অগ্রসরতার জীবনের কথা” এই কবিতাই একটি শব্দ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো, এই রকম “এদেশ সবুজ কেন, বললেন এক বিটনিক”- আল মাহমুদের এই দশকটি সত্যিকার ভাবে আমাদের সাহিত্যে মূল্যবান ঘটনা বহুল। বললাম এই কারণে যে, এই দশকেই সূচিত হয়েছিল নানাবিধ আন্দোলন, আমেরিকান কবি এ্যালেন্স গ্রিন্সবার্গ এর অনুসারীরা তাঁদের কাব্য আন্দোলনে কাঁপিয়ে দিয়েছিল মার্কিনীদের হৃদয়। এ্যালেন্স গ্রিন্সবার্গ ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন ভিয়েতনামে মার্কিন হামলার বিরোধী আন্দোলনে। পশ্চিম বঙ্গে শুরু হয়েছে হ্যাংরি জেনারেশনের তথাকথিত আন্দোলন, আমাদের এখানেও সেইরকম আভাস পেয়েছিলেন কি কবি আল মাহমুদ? তাই এই কাব্য ব্যবহার? এই রকম বাক্য আল মাহমুদ এরপর অন্য কোন কবিতাই ব্যবহার করেননি, কারণ বোধ হয় ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেননি। তবে এই কবিতাই আমি বারবার পড়ে আমার যেটা মনে হয়েছে, আল মাহমুদ যতদূর সম্ভব একটি দুর্বল কবিতা হিসেবে ধরেই নিয়েছেন, তবুও কবিতার একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে, কারণ কবিতাটি আর যায় হোকÑ সিকান্দার আবু জাফরের মত খ্যাতিমান সম্পাদকের দ্বারাই বাছাই হয়ে ‘সমকালে’ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এই কবিতার সাথে আল মাহমুদের আর একটি কবিতার সাথে অবশ্যই সমিলতা দেখা যেতে পারে। কবিতাটি হল ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থে গ্রন্থিত “ফেরার পিপাসা”- এই প্রসঙ্গগত উল্লেখযোগ্য কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘সমকাল’ এর একমাত্র কবিতা সংখ্যা-১৩৭১-১৩৭২ বঙ্গাব্দে এই, কবিতাটির আঙ্গিক প্রকরণ আমাদের আলোচ্য কবিতার মত অক্ষরবৃত্তে ১৮ মাত্রায়। যখন কবি বলেন-

ফিরে যেতে সাধ জাগে, যেন ফিরে যাওয়ার পিপাসা

জাগায় দূরের নদী, ঐতো হাটের নাও মাগো

দখিনা বাতাস- এ দ্যাখ ভেসে গেল সমস্ত সোয়ারী-

হরিণ বেড়ের মাঠে পৌঁছে যাব সন্ধ্যার আগে।

ফেরার পিপাসা: কালের কলস)


অবশ্যই আল মাহমুদ এই কবিতাটি “প্রত্যাবর্তন” কবিতার মত জনপ্রিয়তা উপার্জন করেননি। কিন্তু আমাদের ভেতরদেশে দু’টি কবিতা নিয়ে যখনই বারবার পরস্পর বিরোধী ভাবনা ভেবেছি মনে হয়েছে এই অগ্রন্থিত কবিতার বিষয়বস্তুর ব্যর্থতা বোধই কবি আল মাহমুদকে ঐ কবিতাটি সৃজন করে নিয়েছেন।

আমার মতামত সম্পূর্ণ অভ্রান্ত, এমন দাবি করবো না, তবে বিষয়টি নিয়ে আল মাহমুদ-এর ভক্তদের ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

একজন কবিকে, একজন সাহিত্যিককে, এমন কি, একটি গ্রন্থকে (সৃজনশীল কিংবা মননশীল) দুই রকমভাবে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, কাব্য বা সাহিত্যগত তুল্যমূল্য স্বরূপে; এবং দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক তত্ত্ব আবিষ্কারের উপায় স্বরূপে। প্রথমোক্ত পন্থা অবলম্বন করা হলে আমরা কেবলমাত্র গ্রন্থ বা গ্রন্থকারের দেশকাল-নিরপেক্ষ কাব্য বা সাহিত্য কৃতিত্বের দোষ-গুণ বিচারে সমর্থ হই। দ্বিতীয় প্রথা অবলম্বন করা হলে আমরা তা যে নির্দিষ্ট সময়ে যে দেশে বা যেরূপ বিশ্বব্যবস্থায় রচিত, সে দেশ ও বিশ্বব্যবস্থার তৎসাময়িক অবস্থাসমূহের আলোচনা দ্বারা এবং তৎকালীন অন্যান্য সাহিত্য-কাব্যকর্মের সঙ্গে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে রচনাটি বা রচয়িতার দোষ ও গুণ, সাফল্য ও ব্যর্থতার কার্যকারণ সম্পর্কে অবহিত হতে পারি। সাহিত্যতত্ত্বে কাব্যের দোষ-গুণ বিচার করাই সমালোচনা-আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক প্রথায় আলোচনা উক্ত বিচারের সহায়তাসাধন করে মাত্র। কিন্তু এই উভয় পদ্ধতির মিলিত সাহায্যেই যথার্থ সমালোচনা করা যায়। বর্তমান বাংলাদেশে এবং ব্যাপকার্থে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের নিরিখে সমকালের অন্যতম প্রধান কবি ও বহুমাত্রিক সাহিত্য-প্রতিভা আল মাহমুদকে বীক্ষণের জন্যেও প্রয়োজন একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণী কাঠামোর সাহায্য নেয়া। ২. পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকমুক্ত তৎকালীন বাংলাদেশের ঢাকায় একসঙ্গে জীবন শুরু করেন কয়েকজন তরুণ---বাচ্চু (শামসুর রাহমান), হুমায়ুন (ফজল শাহাবুদ্দীন), শহীদ কাদরী। এদের সঙ্গে এসে যুক্ত হন মফস্বলের আরেকজন, আল মাহমুদ। সেই পঞ্চাশে, বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-কবিতার নানা ক্ষেত্রে প্রথম যৌবনের উত্তাপে কর্মপ্রবণ ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, কায়সুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং আরও অনেকেই। বস্তুত এদের হাতেই আধুনিক বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের সাহিত্য সৃজিত হয়। কারণ, এদের অগ্রবর্তীরা, যেমন ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, শওকত ওসমান, আবুল হোসেনরা এসেছিলেন কলকাতার খানিকটা অভিজ্ঞতা নিয়ে। ঢাকায় বা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উত্থান ও বিকাশের ধারায় পঞ্চাশ দশকের কবি ও লেখকগণ সব দিক থেকেই স্বতন্ত্র, বিশিষ্ট এবং ভিত্তি স্থাপনকারী। পঞ্চাশের কবি ও লেখকগণ শুরুটা একই সঙ্গে করলেও ক্রমেই তাদের বিশিষ্টতা ও স্বাতন্ত্রকিতা সুস্পষ্ট হয়ে ভিন্ন ভিন্ন ঘরানায় পর্যবসিত হয়। এই পার্থক্য কেবল শৈলী বা স্টাইলে নয়; চিন্তা, চেতনা এবং বিশ্বাসেরও। আল মাহমুদের সামগ্রিক প্রবণতার মধ্যেও আলাদা একটি অভিব্যক্তি সমকালের আর সকলের চেয়ে তাঁকে পার্থক্যপূর্ণ করেছে। সোনালী কাবিন কিংবা মায়াবী পর্দা দোলে ওঠে থেকে যে আল মাহমুদের যাত্রা, সেটা বখতিয়ারের ঘোড়া, প্রহরান্তে পাশ ফেরা, কাবিলের বোন ইত্যাদি হয়ে বার বার তাঁর সম্পর্কে জানাচ্ছে যে, আমি দূরগামী। এ কারণেই ঢাকা এবং কলকাতা মিলিয়ে অখন্ড বাংলা সাহিত্যের বিবেচনায় কবিতার প্রসঙ্গ এলেই পঞ্চাশের কবিদের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় আল মাহমুদকে। তাঁর ‘গাঙের ঢেউ-এর মতো বলো কন্যা কবুল কবুল' লাইনটি থেকে ‘ঘুমের মধ্যে জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠি' ধরনের পংক্তিগুলো বাংলা কবিতায় মিথ হয়ে আছে। যারা তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ যেভাবে বেড়ে ওঠি পড়েছেন, তারা জানেন, কবিতা ও কাব্যচর্চার মতোই জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাতেও আল মাহমুদ একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। বোহেমিয়ান-সৃষ্টিছাড়া তারুণ্য-যৌবন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা পরবর্তী বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রোমান্টিক উন্মাতালতা, গণতন্ত্র ও শুভতার সংগ্রাম এবং সর্বপরি আস্তিক-দার্শনিকতার মাধ্যমে একটি বিশ্বাসী আবহে পৌঁছার প্রয়াসে আত্মার মুক্তির অন্বেষণ আল মাহমুদের জীবন ও কবিতার অভিমুখকে একটি যৌক্তিক পথরেখায় নিয়ে এসেছে। এই মনোদার্শনিক গতিপথ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ থাকার কারণে তিনি গোড়া থেকেই বলতে পারেন যে, ঢাকা হবে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, কবিতা ও কীর্তির কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র; বৈশ্বিক রাজধানী। এবং তাঁর কবিতায় ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশের প্রকৃতি, প্রেম, সংগ্রাম, সংক্ষোভ, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, জীবনবোধ সুললিত কাব্যভাষায় উচ্চারিত হয়। তাবৎ বাংলাদেশ ও এর মানবমন্ডলীকে ঘিরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যাবতীয় প্রপঞ্চকে নিজের অভীষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-বিশ্বাসের নিরিখে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জারিত করে চিরায়ত বাংলার মানবকণ্ঠে কথা বলার ইতিহাসই আল মাহমুদের জীবনেতিহাস। ৩. আল মাহমুদের সাহিত্যজগত এবং কাব্যবোধ তাঁর বিশ্বাস ও মৃত্তিকার পাটাতনে দৃঢ়মূলপ্রবিষ্ট। তাঁর ভেতরে লুকিয়ে থাকা রোমান্টিক, বোহেমিয়ান চরিত্রটি নিজের বিশ্বাসনির্ভর দার্শনিকতায় বেগবান হয়ে স্বপ্ন ও কল্পনার পথে যেমন বিচরণ করে, তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পথেও প্রদক্ষিণ করে। তাঁর কবিতার মূল সুর ভালোবাসা, দেহগত কিংবা আত্মাগত। ছন্দের হাত তাঁর অসাধারণ। ( পাঠক মনে করতে পারেন, আমার মায়ের সোনার নোলক...এর কথা।) তাঁর কবিতায় রয়েছে দেশজ শব্দের ছড়াছড়ি, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের ভাষাবৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ কবিতায়, সনেটে, বিষয়ভিত্তিক কবিতায় তিনি অনায়াস। ধারাবাহিক ফিচার, কলাম, প্রবন্ধেও তিনি সফল। উপন্যাস বা ছোটগল্পে তাঁর তীক্ষ্ণ মানবিকবোধ, গভীর পর্যবেক্ষণ এবং আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সচেতন পারঙ্গমতা অলক্ষ্যণীয় নয়। সমগ্র আল মাহমুদকে সামনে রেখে পঞ্চাশের অন্য সবার রচনাবলিকে তুলনামূলক বিবেচনা করা হলে, তাঁর চিন্তা, বিশ্বাস, শৈলী, কাঠামো ইত্যাদির অন্তর্নিহিত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং এ কারণে তাঁকে কেবল তুলনা করা যায় তাঁরই সঙ্গে। ব্যক্তিসত্তা এবং লেখকসত্তায় আল মাহমুদ স্বাতন্ত্রিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন সব সময়ই। ছোট-খাট, সাধারণ দর্শনের অবয়বকে তিনি দ্রোহ ও সাহসের উচ্চতর জায়গায় নিয়ে গেছেন আপস ও আত্মসমর্পণ না করার ঐতিহ্যে। যা তিনি বিশ্বাস করেন, শত বিরূপতাতেও সেটা বলতে দ্বিধা করেন না তিনি। প্রবল প্রতিপক্ষকে সামনে রেখেও স্বমত প্রকাশ ও প্রচারে তিনি অকুতোভয়। ফলে এই খর্বাকায় মানুষটি পক্ষ এবং প্রতিপক্ষের সামনে মহীরুহের আকার ও আয়তন অর্জন করেন। তীব্র সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য, গন্তব্যহীনতার মধ্যে দিয়ে মধ্যবিত্তের যাপিত-জীবনের এক-একটি পর্যায় অতিক্রম করে আল মাহমুদ নিজের বিশ্বাসের তরীটিকে ভাসিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন কাঙ্ক্ষিত মোহনায়। জীবনের শেষ পর্যন্ত টেনে এনেছেন নিজের চিন্তা ও আস্থার যাবতীয় অনুসঙ্গ। এনেছেন নান্দনিক সুষমায়। মননশীলতার স্নিগ্ধতায়। তাঁর সঙ্গে মিল বা অমিলের পরেও কেউ তাঁকে এড়িয়ে যেতে বা অবজ্ঞা করে আধুনিক বাংলা কবিতা ও সাহিত্য আলোচনা-পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়নি। তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র সাযুজ্য নেই, এমন পক্ষও তাঁকে মান্য করতে বাধ্য হয়েছে তাঁর বিশ্বাসজাত-প্রকাশের সততার জন্য; তাঁর কাব্যশক্তির জন্যে। ব্যক্তি ও কবি হিসেবে আল মাহমুদ সকল আলোচনা-সমালোচনার পরেও নিবিষ্ট-কর্মের নৈপূণ্যে সফলতার ঠিকানাটি খুঁজে পেয়েছেন। যা তাঁর সমকালের সহযাত্রীদের অনেকেই পাননি। কারণ, তিনি বিভ্রান্ত ছিলেন না; ছিলেন নিজ বিশ্বাসে বলীয়ান। এবং তাঁর বিশ্বাস ও বক্তব্য এমন একটি সার্বজনীনতা লাভ করেছে যে, তিনি কবি ও দার্শনিকরূপে পৌঁছে গেছেন বৃহতায়ন মানবসমাজের মর্মমূলে। মূলত তিনি মানুষের শাশ্বত বিশ্বাসকে কবিতার ভাষায় গেয়ে গেয়ে কাল-কালান্তরে জাগরুক রেখেছেন। একজন কবি যখন নিজের এবং অপরাপর ব্যক্তিগণের কথা বলতে বলতে জাতির কণ্ঠস্বরে পরিণত হন, তখন তিনি তাঁর সফলতার শীর্ষ বিন্দুটিকে স্পর্শ করার অমীয় আনন্দ উপভোগ করেন। ইতিহাসে খুব কম কবিই এমন অপার আনন্দের সন্ধান পেয়েছেন। ৪. ব্যক্তিগতভাবে পঞ্চাশের কবিগণের মধ্যে ফজল শাহাবুদ্দীন এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও সংশ্লেষ সবচেয়ে বেশি। ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতা একটি ঘোরের মতো আত্মমগ্ন জগতকে উন্মোচিত করে। তাঁর ব্যক্তিত্ব নানা সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার পরেও অনেককেই আকৃষ্ট করে। তুলনায় আলাউদ্দিন আল আজাদ মৃদুকণ্ঠী, নীরব ও নিভৃতচারী। আমাদের কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যখন জীবনের শেষ বছরগুলোতে অধ্যাপনা-গবেষণায় ব্যাপৃত ছিলেন, তখন ঢাকার পূর্ব-যোগাযোগের নিরিখে আমি বহু বহু বার দীর্ঘ আড্ডা ও আলোচনায় লিপ্ত হয়েছি তাঁর সঙ্গে। তাঁর কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্পসহ লেখালেখির নানা প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় তৎকালের বাংলা বিভাগের কিছু কিছু ছাত্রছাত্রী আমাদের অনুসরণ করেছে; যারা এখন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। আলাউদ্দিন আল আজাদের ওপর যে মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ ‘গতিধারা প্রকাশনী' থেকে বের হয়েছে, তাতে আমার একাধিক রচনা রয়েছে এবং তাঁর ওপর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রচুর লেখারও সুযোগ ঘটেছে। পঞ্চাশের আরেক অন্যতম কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার ভালো পরিচয় ছিল, বলা যাবে না। মাত্র একবার তাঁর সঙ্গে আমার চাক্ষুষ দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। আইয়ুব হোসেন ‘বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ'-এর একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। সেখানে আমরা আলোচক ছিলাম। আরও ছিলেন আহমদ শরীফ এবং বশীর আল হেলাল। বলতে দ্বিধা নেই, মানুষ হিসেবে, আচরণে ও ব্যবহারে, শামসুর রাহমান অতুলনীয় শিষ্টাচারের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ও বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হয়েও তাঁর সঙ্গে চমৎকার সৌজন্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা যায়, যেটা স্বমতের অনেকের সঙ্গেই, অনেক সময় রাখা সম্ভব হয় না। আল মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক খুবই আনুষ্ঠানিক। প্রথম তাঁকে দেখি ১৯৮৩ সালে কিশোরগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একজন কর্মকর্তারূপে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে সম্ভবত ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে আমার অনুজপ্রতীম তরুণ কবি ইশারফ হোসেন তার ‘সকাল সাহিত্য গোষ্ঠী'-এর পক্ষ থেকে জাতীয় জাদুঘরে আল মাহমুদের একটি সংবর্ধনার আয়োজন করে, যাতে আমি সম্মাননাপত্র পাঠ করে সেটা কবিকে উপস্থাপন করি। প্রসঙ্গত, সেই অনুষ্ঠানে আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘নিকট ভবিষ্যতে ঢাকা হবে বাংলা ভাষার রাজধানী'। তাঁর বক্তব্যের আলোকে দৈনিক সংগ্রাম-এর জন্য অনুষ্ঠানের নিউজটিও কভার করেছিলাম আমি, যা প্রথম পাতার অষ্টম কলামের শীর্ষদেশে ছাপা হয়। তারপর মূলত পল্টনে ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিকণ্ঠ কার্যালয়ে আল মাহমুদের সঙ্গে একাধিকবার দেখা, সাক্ষাৎ, বাক্যবিনিময় হয়েছে। আরেকটি বিচিত্র যোগযোগ তাঁর সঙ্গে গড়ে ওঠে সাপ্তাহিক রোববার-এর মাধ্যমে। আমি তখন মোটামুটিভাবে পত্রিকাটির দেখাশোনা করি। সহকর্মী-সাংবাদিক সৈয়দ কাজিম রেজা একদিন আল মাহমুদের একটি দীর্ঘ কবিতা নিয়ে আসেন। কিন্তু কোনও আর্টিস্টকে হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত কোলাজধর্মী অলঙ্করণের মাধ্যমে আমি নিজেই এক পৃষ্ঠায় আল মাহমুদের কবিতাটি সজ্জিত করি। সবাই তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে অলঙ্করণে আমার নাম ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। এসব তথ্য বলার উদ্দেশ্য হলো, আল মাহমুদ আমার আগ্রহ ও জ্ঞাত জগতের বাইরে ছিলেন না; যেমন ছিল না তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলি। এটাও বলে রাখা ভালো যে, আমি ও আমার বন্ধুবর্গ, যারা আশি দশকের কবি-লেখক নামে পরিচিত, তারা মূলত বহুমাত্রিক পাঠের অভিজ্ঞতার মধ্য নিয়ে অতীতকে মন্থন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রয়াসী ছিলাম বা আছি। এই তথ্যটিও জানানোর প্রয়োজনবোধ করেছি একটি বিশেষ কারণে। কারণটি হলো, অতি সম্প্রতি কবি ও সম্পাদক ফারুক মাহমুদ, আমাদের উভয়েরই অতিপ্রিয় ও স্নেহধন্য, নববই দশকের একজন তরুণ কবির একটি মন্তব্য আমাকে জানালেন। সে বলেছে, ‘আজকাল আর রবীন্দ্রনাথ পড়া যায় না।' মানে তার কাছে রবীন্দ্রনাথ পাঠের অযোগ্য! কবিতার পাশাপাশি সে টিভি ও মিডিয়াতে যথেষ্ট নামডাক করেছে। অতএব তার নামটি উল্লেখ করে বেচারাকে বিব্রত করছি না। শুধু এটুকুই জানাচ্ছি যে, আমরা আমাদের সময় ও অভিজ্ঞতাকে ঋপদী ও সমকালীন সাহিত্য ও কাব্যের পাঠের মাধ্যমে ঋদ্ধ ও পূর্ণ করেছি। অন্যান্যের মধ্যে আল মাহমুদও সে পাঠতালিকায় ছিলেন। কিন্তু যখন শুনতে হয় যে, ‘আজকাল আর রবীন্দ্রনাথ পড়া যায় না;' তখন অন্যান্যরা অনাগতকালে কতটুকু পঠিত হবেন, সেই প্রশ্ন ও সংশয় অবশ্যই তো থাকে! লেখকের মান নেমে যাওয়া কিংবা পাঠকের মান নেমে যাওয়ার উভয়বিধ ঝুঁকির মধ্য দিয়েই তো সাহিত্য এগিয়ে এসেছে এতোটুকু দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ। বাংলা সাহিত্যের সেই পথে কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, তিনজনকে কখনওই বাদ দেয়া যাবে না---মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। এই তিনজনকে স্তম্ভের মতো ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাবৎ বাংলা সাহিত্য। এই তিনটি মহাসূর্যকে ঘিরে রয়েছে শত-সহস্র তারার মেলা। সেই আলোকিত মন্ডলে আল মাহমুদের অবস্থান কোথায় হবে? মহাকালে দখলে থাকা এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার অধিকার আমার নেই। আমি যা বলতে পারি তা হলো, আল মাহমুদ শত-সাধারণের মধ্যে মিশে থাকবেন না; অবশ্যই থাকবেন স্বতন্ত্র আলোর ঔজ্জ্বল্যে; স্বনির্মিত একটি বিশেষ ও দৃষ্টিগ্রাহ্য অবস্থানে। কারণ, আল মাহমুদের কবিতা ও সাহিত্যকর্মে যে সমাজ ও মানুষগুলো উঁকি মারে, তা একান্তভাবেই বাংলার নিজস্ব প্রাণের প্রকাশ। বাংলার নিজস্ব প্রাণের প্রকাশের মাধ্যমে আল মাহমুদ যে সাহিত্যজগত সৃজন করেছেন; যে ভাবসম্পদ গড়ে তুলেছেন; তা আবশ্যিকভাবেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম অর্জনসমূহের অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিজের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকার দায়বদ্ধতায় আল মাহমুদের এমন স্বর্ণালি সাফল্যকে স্বীকার না করে কীভাবে পারবে?

আমাদের এখানকার মানুষদের একটি বড় প্রবণতা হচ্ছে প্রতিভাকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা থেকে বিচার করা। এবং এর ফল যে কত মর্মান্তিক হতে পারে আল মাহমুদ তার বড় প্রমাণ। শুধু আল মাহমুদ কেন, কবি গোলাম মোস্তফার জন্মশতবর্ষ কি আমরা পালন করেছি? গোলাম মোস্তফার ঋণ কি আমরা শোধ করতে পেরেছি? হ্যাঁ, দু’একটি ভুল তিনি করেছেন সত্য। কিন্তু আমাদের এখানে ধোয়া তুলসী পাতাটি কে? মাঝে মধ্যে জানতে ইচ্ছে করে। শুধু একজনের দিকে আঙুল তুলে সবাই পার পেয়ে যায়, এটি কীভাবে হয়, এই প্রশ্নই আমার মনে জাগে। আমরা প্রতিভার মূল্যায়ন করতে শিখিনি, তার মর্যাদা দিতে শিখিনি। তার রাজনৈতিক তৎপরতা খুঁজতে গোয়েন্দাগিরি করতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করি না। এই যে প্রবণতা এই প্রবণতা থেকে আমরা কবে মুক্তি পাবো তা জানি না।


আল মাহমুদ এই সমাজের একজন প্রতিনিধি। তাকে যখন আমি একজন মৌলিক কবি বলতে যাই অনেকে আমার চোখে আঙুল দিয়ে বলেনথ আল মাহমুদের কবিতায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রভাব আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কার কবিতা প্রভাবমুক্ত? আমরা সমাজে কি কাজ ভাগ করে নিই না? কোনো সমাজ এগোবে না যদি আমরা কাজ ভাগ করে না নিতে পারি। এবং যার ভাগে যতটুকু কাজ পড়ে, তাকে ততটুকু কাজই তো করতে হয়। আল মাহমুদের গ্রাম, আল মাহমুদের শহর, আল মাহমুদের নাগরিকতা এ সবই তো তার আওতার মধ্যে।

আল মাহমুদ যখন ঢাকায় আসেন তখন এই শহরের জনসংখ্যা কত ছিল? ত্রিশ হাজারও হবে কি-না সন্দেহ আর আজ ঢাকার লোকসংখ্যা কত? সেই সময় আধুনিকতার সংজ্ঞা বা প্রভাব কী ছিল আর আজ আধুনিকতার সংজ্ঞা বা প্রভাব কী? রবীন্দ্রনাথ তো অভিযোগই করেছেন- আধুনিকতা আমাকে দেউলিয়া করেছ। পশ্চিমের ওপর সেই সময়ই আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল সবাই আর আমরা এই সময়ে পশ্চিমের ওপর আস্থা রেখে হাজারো সমস্যা নিজেরা নিজেদের জন্য তৈরি করছি প্রতিনিয়ত। আজ আমার বলতে ইচ্ছে করছে, আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য ফাঁদ পাতি আর নিজেরাই এই ফাঁদে ধরাশায়ী হই এবং অভিযোগ করি অন্যদের বিরুদ্ধে। এই জায়গা থেকে বলতে হয়- আমাদের পায়ের নিচের মাটি শনাক্ত করতে যেমন শিখিয়েছেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তেমনি শিখিয়েছেন আল মাহমুদ। আমি শামসুর রাহমানের কথা ভুলে যাইনি। আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সিকান্দার আবু জাফর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সানাউল হক- কবি হিসেবে এঁরা আমাদের দু’হাতে দান করেছেন। সেখানে আল মাহমুদ আমাদের নগর জীবনের, আমাদের গ্রাম জীবনের, ছোট ছোট বেঁচে থাকার উপাদানগুলো যতœ করে তুলে এনেছেন।

এরপর আমরা দেখব এখানে এসে আল মাহমুদের বেশ বড় রকমের পরিবর্তন হয় বিশ্বাসের জায়গায়। ইসলাম বা আল্লাহ-রসুল বলব না আমি; এক ধরনের ধর্মীয় বোধের কাছে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন। তাই বলে কি আমরা তার অসাধারণ সৃষ্টির কথা ভুলে যাবো? তার অসাধারণ গদ্য, যা আজও বিমোহিত করে সবাইকে। তার ছড়া; যা কি-না আমাদের শিশুদের মনের খোরাক জোগায় এখনও। আল মাহমুদকে নিয়ে অনেক প্রচার-অপপ্রচার রয়েছে। এর অনেকটা অসত্য বলেই আমি জানি। কারণ অনেক কিছুই স্বচক্ষে দেখার এবং জানার সুযোগ আমার হয়েছে। আল মাহমুদের আরেকটি জন্মদিন চলে গেল। তিনি আরও অনেক দিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার আরও অনেক সৃষ্টি দ্বারা আমরা মোহিত হবো। 

আল মাহমুদের অমর কাব্যগ্রন্থ সোনালী কাবিন সমকালীন বাংলা কবিতার একটি বাঁকের নাম। বলা হয়ে থাকে, তিনি যদি শুধু এই একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ রেখে যেতেন, তাতেও বাংলা কবিতার রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে থাকতেন। কবি পরিচয়টি আল মাহমুদের ‘ট্রেডমার্ক’ হলেও তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। তবে তাঁর কাব্য প্রতিভার কাছে অন্য সব পরিচয় ফিকে হয়ে যায়। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি পত্রিকার প্রুফরিডার থেকে নিজেকে জাতীয় দৈনিকের প্রধান সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

একটি সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের বহু নদীর পানি স্বর্গীয় পীযূষজ্ঞানে আক্ষরিক অর্থেই হাতের আঁজলায় ভরে তিনি পান করেছেন। তাঁর এই মৃত্তিকাবর্তী মোহনীয় মানস তাঁর কবিতার মধ্যেও দেখা যায়। আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেও তিনি ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে কবিতায় অবলম্বন করেছেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনন্য কীর্তি। তাঁর জাদু স্পর্শে সৃষ্টি হয়েছে অনন্য পঙ্ক্তিমালা। যে মৃত্যু তাঁকে নিয়ে গেল, সেই মৃত্যু নিয়ে ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় তিনি লিখে গেছেন: ‘প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ/ মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস/ যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন/ তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস।’

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ